উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে জোড়াফুল প্রতীক রাজ্যের রাজনীতিতে একটা আবেগের নাম ছিল, আজ সেই প্রতীকের দখলই চলে গেল নির্বাচন কমিশনের ‘সাময়িক নিয়ন্ত্রণে’। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের দুই হেভিওয়েট কেন্দ্র—নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে বিধানসভার উপনির্বাচন। ঠিক তার আগে বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন কমিশন (Election Fee) যে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশিকা জারি করেছে, তাতে কার্যত রাজনৈতিক মহলে ‘ভূমিকম্পে’র সৃষ্টি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়—কারও পক্ষেই আপাতত বরাদ্দ হলো না তৃণমূলের (TMC) ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক। আপাতত তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করল নির্বাচন কমিশন।
দলের নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপড়েন চলছে। একদিকে মমতার কালীঘাট শিবির এবং অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী শিবির—দলের অধিকার ও তহবিলের দখল পেতে লড়াইয়ে নেমেছে মরিয়া হয়ে। এই পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনের দামামা বেজে যাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের জ্ঞানেশ কুমার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কে আসল তৃণমূল আর কে নকল, তার চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি বা ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক—কোনোটাই ব্যবহার করতে পারবে না কোনও পক্ষই।
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, আসন্ন উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে লড়ার জন্য দুই শিবিরকেই কমিশন নির্ধারিত মুক্ত প্রতীক বা সংরক্ষিত তালিকা থেকে আলাদা আলাদা নতুন প্রতীক বেছে নিতে হবে। আগামীকাল সকাল ১১টার মধ্যে এই নতুন নাম এবং প্রতীক বেছে নিতে হবে। তবে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল তাঁর নিজের হাতে আঁকা সেই জোড়াফুল? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এটি স্রেফ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্ত। দল ও প্রতীকের আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায় এখনও আসার বাকি রয়েছে।
গোটা ঘটনার প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হয়েছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। গত শনিবার কালীঘাট শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির—উভয় পক্ষকেই ডেকে প্রাথমিক শুনানি সেরেছিল কমিশন। সেই বৈঠকে ঋতব্রত শিবিরকে তাঁদের দাবির সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশ মতো নথিপত্র জমা পড়ার পর, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টেয় ঋতব্রত শিবির এবং বিকেল ৪টের সময়ে মমতা শিবিরের প্রতিনিধিদের ফের তলব করে নির্বাচন কমিশন। দুই পক্ষের যুক্তি ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার পরই এই বড় পদক্ষেপ করে কমিশন।
কমিশনের এই নির্দেশকে এক লহমায় খারিজ করে দিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “এই অর্ডার আমরা মানছি না। কারণ এই রায়ের মধ্যে অনেক আইনগত ফাঁক রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এবার যা করার, আমরা করব।”
তবে শুধু কমিশনকে নিশানা করাই নয়, বিদ্রোহী ঋতব্রত শিবিরকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি কল্যাণ। তাঁর বক্তব্য, “আমরা যেমন নাম প্রতীক পেলাম না, বিদ্রোহী শিবিরও সেটা পেল না। ফলে ঘাসফুল প্রতীক ওদের, দল ওদের, নাম ওদের এইসব দাবি যারা করছিল তাদের হাতেও কিছু থাকল না।” তবে আসন্ন উপনির্বাচনে নতুন নাম ও প্রতীক সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করা যে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখছে ঋতব্রত শিবির। প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করার রায়ে কিছুটা স্বস্তি পেলেও লড়াই যে শেষ হয়নি, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক আখরুজ্জামান। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক আমাদের কাছেই থাকবে বলে আমি বিশ্বাসী।”
কিন্তু প্রশ্ন হল, উপনির্বাচনের কড়া লড়াইয়ের ঠিক মুখে প্রতীক ও নাম খুইয়ে কীভাবে ময়দানে নামবে দুই পক্ষ? ছাব্বিশের এই রাজনৈতিক সমীকরণে জোড়াফুলের এই সাময়িক বনবাস বাংলার রাজনীতিতে কোন নতুন মোড় আনে, সেদিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।

