তন্দ্রা চক্রবর্তী, কোচবিহার: স্বল্প সঞ্চয়েই মাকে ঘরে আনার সাধ। সেই সাধ থেকে কোচবিহার (Cooch Behar) শহরের সাহিত্যসভা বাই লেনের নবোদ্যোগ সংঘে শুরু হয়েছে দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026)। গত বছর প্রথমবার পুজোর আয়োজন করেছিলেন ২০ জন মহিলা। এবার দ্বিতীয় বছরে পা দিল তাঁদের উদ্যোগ। আকারে-বহরে ছোট এই পুজোর বাজেট মাত্র ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। নেই থিমের চমক, নেই জাঁকজমক। শুধু রয়েছে নিজেদের সামর্থ্যে মাকে ঘরে আনার আনন্দ আর আন্তরিকতা।
চাঁদা তোলা থেকে ঠাকুর বায়না, ঢাকি জোগাড় থেকে পুরোহিত, প্যান্ডেল, সবটাই মহিলারা নিপুণ হাতে সামলাচ্ছেন। শুধু ঠাকুর আনা আর বিসর্জনের সময় বাদ দিয়ে পুরো আয়োজনের নেপথ্যে থাকেন বাস্তবের দশভুজারা।
তাঁদের মধ্যে একজন তৃষা পাল। বাড়িতে ছোট্ট মেয়ে, সংসার, ঠাকুরের জামাকাপড়ের ছোট্ট দোকান রয়েছে। একইসঙ্গে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নিজের পড়াশোনাও চালাচ্ছেন। দুই হাতে সেসব সামলে পুজোর এ টু জেডে রয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘সবার গল্পটাই এক।’ কমিটির আরেক সদস্য কণিকা চৌধুরী বললেন, ‘আমরা গৃহবধূরা হাতখরচ বাঁচিয়ে কিছু না কিছু জমিয়েই ফেলি। সেই টাকাতেই মাকে আনা।’
পাড়ার বাইরে চাঁদা তুলতে যান না তাঁরা। পাড়ার যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁরা নিজের মতো করে দেন। বাকিটা আসে নিজেদের ঘর থেকেই। সংসার খরচ, হাতখরচ বাঁচিয়ে প্রতি মাসে আড়াইশো টাকা করে জমান তাঁরা পুজোর জন্য। বছরে জমে তিন হাজার টাকা। এর বাইরেও কেউ দেন ঠাকুরের খরচ, কেউ একদিনের ভোগের দায়িত্ব নেন। এভাবেই মাকে ঘরে আনেন তাঁরা।
চাকরি পাওয়ার পর গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা দিয়েছিলেন কমিটির আরেক সদস্য দোলন বর্মন। অনেক বছর পর এই পাড়ায় পুজো শুরু হওয়ায় ফের প্রতিমা দেওয়ার ইচ্ছে জাগে তাঁর। দোলন বলেন, ‘এ বছর নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রতিমা দিচ্ছি। তিন বছর তো দেবই, তারপর দেখি।’ ছেলেমেয়ে দুজনেই বাড়ি ফিরেছেন। তাই এ বছর অষ্টমীর ভোগের দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি। এভাবেই কমিটির কেউ না কেউ এগিয়ে এসে পুজোর কোনও একটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
পুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অবশ্য দায়িত্বের ভাগ আলাদা। সেখানে মহিলারা প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেন। প্রতিযোগিতার আয়োজন, বিচার, নম্বর দেওয়া ও পুরস্কার বিতরণের দায়িত্ব সামলান পুরুষরা। সব মিলিয়ে নবোদ্যোগ সংঘের এই পুজোয় স্বল্প সঞ্চয় আর সম্মিলিত চেষ্টায় মাকে ঘরে আনার স্বপ্ন পূরণ করছেন পাড়ার মহিলারা।
এই পাড়ার বাসিন্দাদের বাড়তি চাহিদা নেই। তাই কোনওমতে রান্নাটুকু সেরে সবাই মেতে ওঠেন পুজোর কাজে। পুজো আসার অনেক আগে থেকে তাই ওই গলিতে শুরু হয়ে যায় পুজো পুজো রব। এ যেন ঘরের মেয়েদের হাতেই ঘরের মেয়ের বোধন।

