শতবর্ষ পেরিয়েও টুংগইল বিলপাড়ায় মহারাম চণ্ডীর পুজো আজও লোকবিশ্বাস, পারিবারিক উত্তরাধিকার ও গ্রামীণ উৎসবের অনন্য মিলনক্ষেত্র। আশ্বিনের অষ্টমী তিথিতে বাংলার উৎসব ও মেলার বর্ণনাতেও স্থান পেয়েছে এই পুজো। তাই আশ্বিনের চারদিনজুড়ে প্রাণ পায় এলাকাটি।
অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: আশ্বিনের দুর্গাপুজোয় (Durga Puja 2026) শুধু অষ্টমী নয়, পুজোর চারদিন ধরেই টুংগইল বিলপাড়ার আবালবৃদ্ধবনিতা মেতে ওঠেন নির্মল আনন্দে। কালের নিয়মে পুজোর রীতিতে পরিবর্তন এলেও মহারাম চণ্ডীর পুজো কালিয়াগঞ্জ (Kaliyaganj) সহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া এই পুজোর উল্লেখ পঞ্জিকার পাতায় রয়েছে। আশ্বিনের অষ্টমী তিথিতে বাংলার উৎসব ও মেলার বর্ণনাতেও স্থান পেয়েছে এই পুজো।
পুজোর সূচনার ইতিহাস এলাকার বাসিন্দাদের জানা নেই। পুজো কমিটির সভাপতি অনুপ দেবশর্মা বলেন, ‘বাপ-ঠাকুর্দার কাছে শুনেছি এই পুজোকে ঘিরে অনেক কাহিনী। একসময় এই এলাকা ভরা জঙ্গল ছিল। দিনে-দুপুরে বাঘের দেখা মিলত। এখানে সিংহের উপর চার হাত মেলে অধিষ্ঠিত হয়েছেন মহারাম চণ্ডী। অনেক বছর আগে শোলানির্মিত মূর্তিতে পুজো হলেও পরবর্তীতে মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে পুজো চলছে। ১০ বছর ধরে কবুতর, পাঠা বলি হয় না। এখন শুধু উৎসর্গের প্রথাটুকু রয়েছে।’ নজরে এল মন্দিরের ভিতর ঝুলছে বলির ব্যবহৃত খড়্গটি।
টুংগইল বিলপাড়ার এমএসকে, নাটমন্দির-ঘেরা মাঠে পুকুরসংলগ্ন এলাকায় মহারাম চণ্ডীর মন্দির। গ্রামীণ পরিবেশে জাঁকজমকের তেমন ছোঁয়া না থাকলেও নিয়মনিষ্ঠায় পূজিত হন মা। মনস্কামনা পূরণে দলে দলে ভক্তের ভিড় জমে মন্দিরে। পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ তথা স্থানীয় বাসিন্দা খেকটু দেবশর্মা বলেন, ‘আশ্বিনের এই ক’টি দিন ছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার পূজিত হন মা। মন্দিরের পার্শ্ববর্তী পুকুরটি মায়ের নামেই সমর্পিত। কথিত আছে, অষ্টমীতে এলাকার প্রতিটি বাড়িতে মায়ের চরণধূলি পড়ে। তাই বিশেষ করে অষ্টমীর দিন টুংগইল বিলপাড়ার প্রতিটি বাড়িতে নিরামিষ রান্না হয়।’ পুজো কমিটির সম্পাদক বিলাস গোস্বামী বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও শুধুমাত্র অষ্টমীতে মহারাম চণ্ডীর পুজো হত। কয়েক বছর ধরে সরকারি অনুদান পেয়ে আমরা পুজোর আয়োজন চারদিনব্যাপী করেছি।’
পুরুষতান্ত্রিক নির্দেশনায় পুজো হলেও এলাকার মহিলারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকেন মায়ের পুজোর জোগাড়ে। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত সকালে উপবাস রেখে স্নান করে তাঁরা পুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হন। স্থানীয় বাসিন্দা কল্যাণী দেবশর্মা বলেন, ‘মহারাম চণ্ডী প্রচুর মানুষের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। পুজোর ক’দিন আগে থেকেই বাড়িঘর পরিষ্কার করি আমরা। পুজোর সময় আমাদের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে আত্মীয়রাও এসে হাজির হন। চোখের পলকে ওই চারটি দিন পেরিয়ে যায়। মায়ের বিসর্জনের দিন গাঁয়ের সবার মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।’

