প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: সময়ের প্রবাহে পুরোনো জমিদারি প্রথা আজ ইতিহাসের পাতায় তলিয়ে গিয়েছে, ক্ষয়ে গিয়েছে দালানকোঠার পলেস্তারাও। তবে বর্ধমান (Burdwan) শহরের খাজা আনোয়ার বেড় এলাকার দাসবাড়িতে আজও অটুট দেড়শো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। দুর্গোৎসবে (Durga Puja 2026) আর পাঁচটা ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি বা বনেদি ভিটেয় দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর উগ্র ও রণংদেহী রূপের পুজো দেখা গেলেও, দাসপরিবারে আরাধনা করা হয় সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। সেখানে দেবী শান্ত ও স্নিগ্ধ ‘হরগৌরী’ রূপে ভক্তদের দর্শন দেন। এই বংশে পুজো আরাধনার প্রথম সূচনা করেছিলেন তৎকালীন জমিদার মাখনলাল দাস। প্রথম দিকে মৃণ্ময়ী মূর্তি গড়ে পুজোর রূপ দেওয়া হতো না, কেবল ঘট স্থাপন করেই বৈদিক নিয়মে মা উমার পুজো সম্পন্ন করা হতো। মাখনলালের সুযোগ্য পুত্র ব্রজেন্দ্রলাল দাস ছিলেন বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় সখা। দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় ব্রজেন্দ্রলালের মনে চরম আক্ষেপ ও বেদনার সঞ্চার হয়েছিল। কথিত রয়েছে, সেই তীব্র ব্যাকুলতার মাঝেই এক রাতে দেবী তাঁকে স্বপ্নে অলৌকিক দর্শন দেন এবং হরগৌরী রূপে মৃণ্ময়ী প্রতিমা গড়ে পুজো শুরুর আদেশ দেন। দেবীর আদেশে হরগৌরী রূপে আরাধনা শুরু করার পরেই ঘরে পুত্রসন্তানের আগমন ঘটে। সেই আনন্দ ও কৃপা স্মরণে রেখেই ব্রজেন্দ্রলাল তাঁর সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখেন ‘দুর্গাচরণ’।
দাসবাড়ির এই ব্যতিক্রমী প্রতিমার গড়নেও রয়েছে বিশেষ স্বকীয়তা। ঐতিহ্যবাহী একচালার কাঠের কাঠামোয় দেবীর ঠিক ডান পাশে অবস্থান করেন দেবাদিদেব মহাদেব। দুই পার্শ্বে বিরাজ করেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী, আর নীচের অংশে ঠাঁই পান কার্তিক ও গণেশ। পঞ্চমীর দিন থেকেই মণ্ডপে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে শুরু হয়ে যায় দেবীর নিয়মনিষ্ঠ পুজো। ভোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের স্বাদ ও প্রথা আজ অবিকৃত রয়েছে; প্রতিদিন দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় খাটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, কাঁঠালি কলা এবং নারকেলের নানা মিষ্টি। পূর্বে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় ছাগবলির প্রথা চালু থাকলেও প্রায় ৮০ বছর আগে তা চিরতরে রদ করা হয় এবং তার জায়গায় স্থান পায় বিশেষ মণ্ডা বলির রীতি।
এই পুজোকে কেন্দ্র করে নানা অবিশ্বাস্য লোককথাও প্রচলিত রয়েছে শহরজুড়ে। পরিবারের বর্তমান সদস্য শিবশঙ্কর দাস জানান, ’আজও মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর সময় দুর্গাদালানের আকাশে দেখা যায় শঙ্খচিল। বিসর্জনের দিনও শঙ্খচিল প্রতিমার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে চক্কর কাটে’। অতীত দিনে এই পুজো মানেই ছিল এক বিশাল আনন্দমেলা। যাত্রাপালা ও মার্গ সংগীতের আসর বসত প্রকাণ্ড নাটদালানে। মূল মণ্ডপ সংলগ্ন দোতলার চিকের আড়াল থেকে অন্দরমহলের মহিলারা সেই সাংস্কৃতিক বিলাস উপভোগ করতেন। এমনকি খোদ বর্ধমানরাজ বিজয়চাঁদ মহতাবও প্রতি বছর সপরিবারে এই ঐতিহ্যবাহী পুজো দর্শন করতে আসতেন। আজ জমিদারি বৈভব হারিয়ে দাস পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ বদলালেও দেবীর ভক্তি ও পূজার্চনার নিখাদ নিয়মে কোনো খামতি আসেনি। খাজা আনোয়ার বেড়ের এই বাড়িটি তাই স্রেফ একটি পারিবারিক পুজো নয়, বরং হারানো এক স্বর্ণালী অতীত ও বিশ্বাসের জীবন্ত দলিল।

