উমার ফারুক, চাঁচল: মালদার (Malda) চাঁচল (Chanchal)-১ ব্লকের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026) চাঁচল রাজবাড়ির। যেখানে এখনও পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখে একচালা, সাবেকি প্রতিমা তৈরি করা হয়। পুরোনো ঐতিহ্য ও পরম্পরা অনুযায়ী সেই প্রতিমা তৈরি করেন পিতা-পুত্র সম্মিলিতভাবে। প্রায় ছয় বছর ধরে পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করেন পিতা দুনি দাস ও তাঁর পুত্র বলরাম দাস। পিতা-পুত্রের হাতের ছোঁয়ায় আজও প্রাণ পায় রাজবাড়ির দুর্গা।
চাঁচল থানার বোয়ালিয়া গ্রামের দুনি দাসের প্রতিমা তৈরি করাই পেশা। বরাবর তিনি বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করতেন। এলাকার পুজোর জন্য প্রতিমা তৈরির বরাত পেতেন। তাঁকে সঙ্গ দিতেন তাঁর পুত্র বলরাম দাস। ছোট থেকেই তিনি ছেলেকে মাটির ঢেলা তুলে দিয়ে হাতে-কলমে প্রতিমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বাবাকে অনুসরণ করে ছেলেও প্রতিমা তৈরির কাজে হাত পাকাতে থাকে। ধীরে ধীরে বাবার যোগ্য সহযোগী হয়ে ওঠে বলরাম। বছর ছয়েক আগে রাজবাড়ির পুজোর প্রতিমা তৈরির বরাত পান দুনি। পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপে বসে প্রতিমা তৈরি করতে হবে। তিনি সেই প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে যান। বাবা-ছেলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা প্রাণ পায়। তখন থেকে তাঁরাই এই প্রতিমা তৈরির দায়িত্বে।
যদিও বাবাকে সহযোগিতা করতে গিয়ে বলরামের পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন সে মাঝপথে পড়া ছেড়ে পাকাপাকিভাবে বাবার সঙ্গে কাজে যুক্ত হয়। প্রতিমা তৈরি করে যা রোজগার হয় তাতেই তাদের সংসার চলে। শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মৃৎশিল্পী দুনি দাস ও তাঁর পুত্র বলরাম দাস নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করেই প্রতিমা নির্মাণ করে চলেছেন।
দুনির কথায়, ‘আমি বাড়িতেই প্রতিমা তৈরি করতাম। যখন যেমন বরাত পেতাম সেই অনুযায়ী কাজ করতাম। বছর ছয়েক আগে রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা তৈরির বরাত পাই। বয়স বেড়েছে, এখন শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। তাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করি।’ ছেলেও ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠছে, বলেন তিনি। অন্যদিকে বলরাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে এই ঠাকুর তৈরি করে বড় হয়েছি। এই প্রতিমা আমাদের কাছে শুধু মূর্তি নয়, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। বাবার কাছ থেকেই শিখেছি কীভাবে মাটির মধ্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে হয়। বাবার দেখানো পথেই কাজ করে যাব।’
এই পিতা-পুত্রের হাতের ছোঁয়ায় প্রতিমা শুধু তৈরি হয় না, যেন রাজবাড়ির ইতিহাসও জীবন্ত হয়ে ওঠে। কুমোরটুলির থিমের ভিড়ে আজও চাঁচল রাজবাড়ির সাবেকি, শান্ত, স্নিগ্ধময়ী দুর্গা মানুষকে টানে। আর সেই টানের পিছনে রয়েছে দুই শিল্পীর নীরব সাধনা, যেখানে আছে বাবার অভিজ্ঞতা আর ছেলের পরিশ্রমের এক অপূর্ব মিশেল।

