Durga Puja 2026 | আলোর বয়ানে পদ্ম-ত্রিশূল

শিক্ষা
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন
শারদোৎসব ২০২৬

সানি সরকার, শিলিগুড়ি : সন্ধ্যা নামলেই অন্য রূপ নেয় অযোধ্যার রামপথ। অযোধ্যা জংশন থেকে রাম মন্দিরের দিকে চলে যাওয়া সেই পথের বাতিস্তম্ভে জ্বলে ওঠে পদ্মের আলো (Lighting), কোথাও হনুমানের গদা। লতা মঙ্গেশকর চক পেরিয়ে সরযুর দিকে এগোলে চোখে পড়ে পদ্মের সঙ্গে ত্রিশূলের (Trishul) নকশা। রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার পর অযোধ্যাকে এভাবেই আলোর মালায় সাজিয়েছে সেখানকার নগরনিগম। দূরের অযোধ্যার সেই আলোর ভাষা কি এবার নতুন করে ধরা দিচ্ছে বাংলার পুজোয়? প্রশ্নটা উঠছে চারপাশের দিকে তাকালেই।

কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, বড় শহরের পুজোমণ্ডপের বাইরে এবার চোখে পড়ছে পদ্ম আর ত্রিশূলের আধিপত্য। শিলিগুড়ি (Siliguri) শহরের পাড়ায় পাড়ায় বেশকিছু জায়গায় আলোকসজ্জায় জায়গা করে নিয়েছে ত্রিশূল। শহর থেকে বাগডোগরা বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার পথেও উড়ালপুল সেজে উঠেছে এমন আলোয়। রাতের অন্ধকারে আলোর কারুকাজে ফুটে উঠছে এই দুই প্রতীক। থিমপুজোর চমক, চলমান ছবি আর রঙিন আলোর ভিড়ে এবার যেন আলাদা করে নজর কাড়ছে পদ্ম-ত্রিশূলের যুগলবন্দি।

হঠাৎ এমন বদল কেন? নিছক শিল্পীর কল্পনা, নাকি আলোর নকশায় ফুটে উঠছে ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক ভাবনার প্রকাশ? পুজোর আলোকে ঘিরে এবার সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। এর পিছনে রাজনৈতিক কৌশল বা কোনও নির্দিষ্ট নীল নকশা থাকার কথা মানতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। বরং তাঁদের ব্যাখ্যায়, এই প্রবণতা ধর্মীয় ভাবনা প্রকাশের স্বাধীনতারই প্রতিফলন।

রাজ্যের পরিষদীয় ও পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ বলছেন, ‘এতদিন সনাতনী আচার-নিষ্ঠা, রীতি-নীতিকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল ভয়ে, সরকারকে খুশি করতে। রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মানুষের ভয় ভেঙেছে। সকলেই ধর্মোচ্চারণ করতে পারছেন নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। বলা যায় পদ্ম বা ত্রিশূল হয়ে উঠেছে মুক্ত চিন্তাধারার প্রতীক।’

প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীর চোখে এই দুই প্রতীকের তাৎপর্য কিছুটা আলাদা। তাঁর কথায়, ‘অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, শুভশক্তির বিজয় ঘোষণার প্রতীক ত্রিশূল। পদ্ম জাতীয় ফুল। রাজ্যে জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুজো উদ্যোক্তারাও পদ্ম এবং ত্রিশূলকে বিজয় ঘোষণার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।’

অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনের প্রশ্ন, ‘পদ্ম ছাড়া কি দেবী দুর্গার পুজো হয়?’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘শিবের শক্তির প্রতীক ত্রিশূল। এই ত্রিশূল দিয়েই মহিষাসুরকে বধ করেছেন দেবী দুর্গা। তাহলে আলোকসজ্জায় পদ্ম এবং ত্রিশূল থাকলে দোষের কোথায়? এতদিন দেখা যায়নি, মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত থাকায়।’

অবশ্য পুজোর আলোর দুনিয়ায় বদল এসেছে প্রযুক্তির হাত ধরেও। থিমনির্ভর পুজোয় গত কয়েক বছরে এলইডি বাতি ও অত্যাধুনিক চিপের ব্যবহার বেড়েছে। সেই প্রযুক্তির সাহায্যে আলোর পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রতিক ঘটনা, চলন্ত ট্রেন কিংবা উড়ন্ত পাখি। বড় মণ্ডপে দেখা যাচ্ছে ত্রিমাত্রিক দৃশ্য ও চলমান ছবি। এই কারিগরির নেপথ্যে চিনের শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তা হলে পদ্ম-ত্রিশূলের নকশার পিছনেও কি চিনের হাত?

শিলিগুড়ির অরবিন্দপল্লির এক আলোকশিল্পীর বক্তব্য, ‘চিন ছাড়া এমন চোখধাঁধানো আলো অসম্ভব। তবে যাবতীয় মডেল গিয়েছে এখান থেকেই। চিনের শিল্পীরা শুধু তৈরি করেছেন।’

অর্থাৎ, প্রযুক্তির হাত ধরে আলোর কারুকাজ পৌঁছে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়। কিন্তু সেই আলোর ভাষা কোথা থেকে আসছে, তার ব্যাখ্যা এক নয়। কারও কাছে পদ্ম-ত্রিশূল ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রকাশ, কারও কাছে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক, আবার কারও চোখে এর মধ্যে ধরা পড়ছে সময়ের রাজনৈতিক সুর। পুজোর আলো তাই এবার শুধু অন্ধকার দূর করছে না, আলোচনারও জন্ম দিচ্ছে। মণ্ডপের বাইরে, রাস্তার মোড়ে, উড়ালপুলের গায়ে ছড়িয়ে পড়া সেই আলোয় উৎসবের পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে সমকালীন বাংলার এক নতুন আখ্যান।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *