Double Decker Bus | স্মৃতির সরণিতে রাজকীয় দোতলা বাস, কোচবিহারের সোনালী ইতিহাসের ফিরে দেখা

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


তন্দ্রা চক্রবর্তী দাস, কোচবিহার: ধুলোমাখা পুরোনো অ্যালবামের পাতা ওলটালে যেমন ফেলে আসা দিনের সুবাস পাওয়া যায়, কোচবিহারের (Cooch Behar) রাজপথের ইতিহাস হাতড়ালেও তেমনই নস্টালজিয়া ভিড় করে আসে। যানজটের এই যুগে দাঁড়িয়ে কি ভাবা যায়, শহরের প্রশস্ত আর ছিমছাম রাস্তায় ছুটে চলেছে আস্ত দোতলা বাস (Double Decker Bus)? আজ থেকে প্রায় ৬০-৭০ বছর আগের রাজার শহর কোচবিহারের ছবিটা ছিল ঠিক এমনই।

কলকাতার (Kolkata) পর গোটা বাংলায় একমাত্র এই শহরেই দেখা মিলত ডাবল ডেকার বা দোতলা বাসের। দোতলার পাশাপাশি ছিল ‘ট্রেলার বাস’— যেখানে সামনের বাসটি লোহার আংটায় পেছনের আরেকটি বাসকে টেনে নিয়ে যেত। সেই ট্রেলার বাসের আয়ু দীর্ঘ না হলেও, রাজার শহরের গর্ব হয়ে দোতলা বাস দাপটের সঙ্গে চলেছে বহু বছর। এখনও সেইসব স্মৃতি অমলিন।

শহরের নাগরিক অরূপজ্যোতি মজুমদারের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল সেই দিনগুলো। তাঁর জেঠু, প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার তখন তুফানগঞ্জ হেড পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। ছোটবেলায় দাদা আনন্দজ্যোতি মজুমদারের হাত ধরে দোতলা বাসে চেপেই জেঠুর কোয়ার্টারে যেতেন, জানালেন অরূপজ্যোতিবাবু।

সেই রাজকীয় বাসগুলোর চালকের কেবিনটি মূল বাসের সঙ্গে আলাদাভাবে জোড়া থাকত। শুরুতে ১২০০ মডেলের তিনটি বাস চলত। ৯০ আসনের বাসগুলো সারাক্ষণ যাত্রীতে ঠাসা থাকত। পরে গাড়িগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় ১৮৫০, ১৮৫১ ও ১৮৫২ নম্বরের তিনটি নতুন বাস আনা হয়। এই বাসগুলোকে ঘিরে কোচবিহারবাসীর স্মৃতির ঝুলি আজও বেশ সমৃদ্ধ। বছর দুয়েক আগে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম (এনবিএসটিসি) থেকে অবসর নেওয়া শ্যামল সরকার সত্তরের দশকের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘তখন স্কুলের নীচু ক্লাসে পড়ি। বাসের দোতলায় ওঠার এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। একবার বাসটা একটা আমগাছের পাশে দাঁড়াতেই জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিব্যি একটা আম পেড়েছিলাম, বিক্সরহাট যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও ভুলিনি!’ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংককর্মী চিন্ময় গোস্বামীর কথায়, ‘মহিলা আর বয়স্করা ছাড়া একতলায় কেউ বসতে চাইতেন না। তখন কোচবিহার অনেকটাই ফাঁকা, তাই দোতলায় বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে সোনাপুর যাওয়ার মজাই ছিল আলাদা।’ নির্মলেন্দু চক্রবর্তী আবার দোতলার পাশাপাশি ট্রেলার বাসে চেপেও দেওয়ানহাট গিয়েছেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, ‘এখনকার যানজটপূর্ণ রাস্তায় এগুলো চালানো কার্যত অসম্ভব।’

১৯৯১-’৯২ সালের পর বাসগুলো রাজপথ থেকে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পুণ্ডিবাড়ি রুটে কেবল স্কুল পড়ুয়াদের জন্য একটি বাস চলত। মাঝে এক দশক পর ২০০৫-’০৬ সালে ‘সবুজের পথে হাতছানি’ পর্যটন প্রকল্পে সপ্তাহে দু’দিন কোচবিহার-রসিকবিল-জয়ন্তী রুটে বাসটি চালানো হয়। এনবিএসটিসি-র আধিকারিকরা জানান, যন্ত্রাংশ বা স্পেয়ার পার্টস না পাওয়ায় গাড়িগুলো বসিয়ে দিতে হয়। তিনটি বাসের মধ্যে দুটি নিলামে বিক্রি হলেও, কোচবিহার হেরিটেজ কমিটি ও নাগরিকদের প্রবল আপত্তিতে শেষ বাসটি আর বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

ঐতিহ্যবাহী সেই শেষ বাসটি আজও টার্মিনাসের এক কোণে অবহেলায় পড়ে রয়েছে। এনবিএসটিসি-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিপলাই জানান, বাসটিকে শহরের সিলভার জুবিলি অ্যাভিনিউয়ের ওল্ড বাসস্ট্যান্ড প্রাঙ্গণে স্থায়ী প্রদর্শনী হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে কাজ বিশেষ এগোয়নি। তাঁর মতে, ‘ঐতিহ্যের এই স্মারক বাঁচাতে নতুন সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।’ রাজার শহরের সেই রাজকীয় ঐতিহ্য কবে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়, এখন তারই অপেক্ষা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *