অমৃতা দে, দিনহাটা: আগে হালকা শীতে দেখা যেত বাড়ির মা-কাকিমারা বসে কাঁথা সেলাই করছেন। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেক শিল্পই এখন বিলুপ্তির পথে। নতুন যুগের ছোঁয়া লাগলেও গ্রামবাংলার কাঁথা সেলাইয়ের যে ঐতিহ্য তা এখনও কোথাও কোথাও রয়ে গিয়েছে। আজও কার্তিক মাস পড়লে দিনহাটার ২ নম্বর ব্লকের (Dinhata) সাহেবগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের দুর্গানগর এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে সেই পরিচিত ছবিটি দেখা যায়। সংসারের হাজারটা কাজের ফাঁকে তাঁরা পুরোনো সুতির কাপড় বিছিয়ে সুই সুতো নিয়ে নিপুণ হাতে সূক্ষ্ম ফোঁড় দেন।
এখনও হালকা রোদে বসে কাঁথা সেলাই করতে দেখা যায় সারথি মোদক, গায়ত্রী মোদক, জ্যোৎস্না মোদকদের। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় যেন ফিরে আসে পুরোনো দিনের শীতকালের স্মৃতি। সারাবছর ধরে তাঁরা পুরোনো সুতির কাপড়, পুরোনো শাড়ি, থান কাপড় জমিয়ে রাখেন। মহিলারা জানান, কার্তিক মাস শুরু হলেও কাঁথা সেলাই করার কথা মনে হয়। এই কাঁথা সেলাই তাঁদের এক প্রিয় অভ্যাস। কাঁথা শুধু যে শীতকালে উষ্ণতা দেয় তা নয়, প্রতিটি সুতোর প্রতিটি টানে যেন যত্ন ও ভালোবাসা থাকে। এখন বাজারে নানা রংয়ের, রকমারি ডিজাইনের নরম কম্বল পাওয়া গেলেও গ্রামের মহিলাদের কাছে আজও সেই হাতে সেলাই করা কাঁথা অমূল্য।
গায়ত্রীর কথায়, ‘ছোটবেলায় দেখতাম মা-কাকিমারা শীতের শুরুতে কাঁথা সেলাই করতেন। তাঁদের দেখে আমরাও শিখেছি। তাই বছরের এই সময়টা কাঁথা সেলাই করতে না বসলে ভালো লাগে না। কার্তিক মাসে তিন-চারটি কাঁথা সেলাই করি।’
তবে এই কাঁথা শুধু নিজেদের ব্যবহারের জন্য নয়, অনেকক্ষেত্রে তাঁরা উপহার হিসেবেও অন্যকে দেন। জ্যোত্স্না মোদক বলেন, ‘আমি প্রতিবছর বেশ অনেকগুলো কাঁথা বানাই। একটা মেয়ের বাড়িতেও পাঠাই। একটা ছেলের বৌয়ের জন্য রাখি এবং বাকিগুলি আত্মীয়দের দিয়ে দিই। শীতে কাঁথা গায়ে না দিলে মনে হয় কিছু যেন একটা অপূর্ণ রয়ে গেল।’
গ্রামের মহিলাদের কাছে কাঁথা সেলাই শুধু কাজ নয়, একপ্রকার আনন্দ। সারথি মোদক হাসতে হাসতে বলেন, ‘কাঁথা সেলাইয়ের সময় কার ফোঁড়গুলি ছোট হয়েছে, কার কাঁথার ডিজাইন কত সুন্দর এইসব বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে একপ্রকার প্রতিযোগিতা চলে।’ দুর্গানগরের এই ছবি প্রমাণ করে যে, কাঁথা সেলাই কেবল শীতের প্রস্তুতি নয়, এক চিরন্তন সংস্কৃতির নিদর্শন।
