ধূপগুড়ি: সিনেমার কোনো ভয়ঙ্কর দৃশ্য নয়, বাস্তবেই এক হাড়হিম করা ঘটনার সাক্ষী থাকল জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি (Dhupguri Homicide)। শনিবার সকালে রক্তমাখা পোশাক এবং হাতে একটি ধারালো চপার নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে থানায় পৌঁছালেন এক যুবক। তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে রাস্তায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষ আতঙ্কে সিঁটিয়ে যান। ধূপগুড়ি থানার (Dhupguri Thana) পুলিশ কর্মীরাও প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু যুবক শান্ত গলায় পুলিশকে জানান, তিনি তাঁর স্ত্রীকে খুন করে আত্মসমর্পণ করতে এসেছেন। এই চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তির পরেই পুলিশ অভিযুক্ত শ্রীকান্ত রায়কে গ্রেপ্তার করে এবং ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ধূপগুড়ি রায়পাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শ্রীকান্ত রায়ের সঙ্গে কয়েক বছর আগে বিয়ে হয়েছিল সোমা রায়ের। বিয়ের পর বেশ কিছু সময় সংসার ঠিকঠাক চললেও সম্প্রতি তাঁদের দাম্পত্য কলহ চরমে ওঠে। শ্রীকান্ত জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী সোমা এলাকারই বাসিন্দা চিরঞ্জিত নামে এক যুবকের সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এই পরকীয়া বিবাদ নিয়ে পাড়ায় একাধিকবার অশান্তি হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সালিশি সভা পর্যন্ত গড়ায়। ওই সভায় এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল— শ্রীকান্ত নিজের স্ত্রী সোমাকে তাঁর প্রেমিকের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে সোমা তাঁর প্রেমিক চিরঞ্জিতের বাড়িতেই বসবাস করছিলেন।
শ্রীকান্ত মেনে নিলেও তাঁর মনের ভেতরে যে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছিল, তা কেউ আঁচ করতে পারেনি। শনিবার সকালে আচমকাই একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে চিরঞ্জিতের বাড়িতে চড়াও হন শ্রীকান্ত। ঘরের ভেতরে ঢুকে সোমাকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করেন তিনি। সোমার আর্তচিৎকার শুনে চিরঞ্জিতের মা বাধা দিতে ছুটে এলে শ্রীকান্ত তাঁকেও অস্ত্র উঁচিয়ে তাড়া করেন। ঘটনাস্থলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মৃত্যু হয় সোমার।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর শ্রীকান্ত পালানোর কোনো চেষ্টাই করেননি। বরং হাতে সেই রক্তমাখা চপারটি নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ তিনি ওই অবস্থাতেই হেঁটে যান। পথচারীরা তাঁকে দেখে ভয়ে রাস্তা ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর একটি টোটো নিয়ে তিনি সরাসরি ধূপগুড়ি থানায় পৌঁছান। পুলিশকে তিনি জানান, “আমি ওকে শেষ করে দিয়ে এসেছি, এখন আমায় গ্রেপ্তার করুন।”
ধূপগুড়ি থানার পুলিশ দ্রুত চিরঞ্জিতের বাড়িতে গিয়ে সোমার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে পাঠায়। অকুস্থল থেকে ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। ধূপগুড়ির আইসি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। প্রাথমিকভাবে পরকীয়ার জেরে প্রতিহিংসা থেকেই এই খুন বলে মনে করা হলেও, এর পেছনে অন্য কোনো প্ররোচনা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক সময়ের স্ত্রীকে নিজের হাতে প্রেমিকের বাড়িতে রেখে আসার পর কেন হঠাৎ এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে ধৃত শ্রীকান্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনায় গোটা ধূপগুড়ি জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
