উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের বিদেশনীতির অভিমুখ যে আমূল বদলে যাচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলল রবিবারের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে। যেখানে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একসময় ‘ব্রাত্য’ হয়ে পড়া পাকিস্তান এখন ঢাকার অন্দরমহলে ব্রাত্য তো নয়ই, বরং পরম মিত্র। জানুয়ারি মাসেই ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল (Dhaka-Karachi Flight) শুরুর ঘোষণা কেবল দুই দেশের আকাশপথকে জুড়ছে না, বরং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের ‘একাত্ম’ হওয়ার পথে চূড়ান্ত ধাপ।
পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে এই বৈঠক নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। হাইকমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। প্রশ্ন উঠছে, এক দশকেরও বেশি সময় যে সম্পর্ক হিমঘরে ছিল, তা হঠাৎ করে এত ‘উষ্ণ’ হয়ে উঠল কীভাবে? আকাশপথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলে ব্যবসা ও পর্যটন বাড়বে ঠিকই, কিন্তু এর সমান্তরালে যে ‘পাকিস্তানি প্রভাব’ বাংলাদেশে পুনরায় জাঁকিয়ে বসবে, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না কূটনৈতিক মহল।
গত ৫ অগাস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অলিন্দে ‘ভারত-বিদ্বেষ’ এবং ‘পাকিস্তান-প্রীতি’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসিনাত্তোর বাংলাদেশে যেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)-র মতো ছাত্র সংগঠনগুলো সরাসরি জামাতের হাত ধরছে, সেখানে ড. ইউনূসের সরকারও ইসলামাবাদের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান, ন্যানোটেকনোলজি বা এআই-এর নামে বাংলাদেশি পড়ুয়াদের পাকিস্তানে পাঠানোর যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তা আসলে তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে একাত্তরের আগের প্রভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ড. ইউনূস বারংবার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির কথা বললেও, কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের শৈত্য বজায় রেখে পাকিস্তানের সঙ্গেই জোটবদ্ধ হতে বেশি আগ্রহী বর্তমান প্রশাসন। লিভার বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের বদলে রোগীদের পাকিস্তানমুখী করার যে প্রস্তাব হাইকমিশনার দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এর মাধ্যমে ঢাকাকে দিল্লি-নির্ভরতা থেকে বের করে এনে ইসলামাবাদের কক্ষপথে ঠেলে দেওয়ার একটি সুক্ষ্ম প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জানুয়ারির সরাসরি ফ্লাইট কেবল উড়োজাহাজের যাতায়াত নয়, এটি আসলে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত। যে ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলে শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি কি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে ফের ‘গলাগলি’তেই শেষ হবে? করাচি থেকে সরাসরি আসা বিমানটি ঢাকায় কেবল যাত্রী নামাবে না, সঙ্গে নামিয়ে আনবে এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ইতিহাসকেও।
