দার্জিলিং: পাহাড়ের রানি দার্জিলিং (Darjeeling)। মেঘ আর রোদ্দুরের লুকোচুরির মতোই রোমাঞ্চকর এই শৈলশহরের ইতিহাস। এবার সেই ইতিহাসকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার পালা। ১ ফেব্রুয়ারি এক অভিনব ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছেন পাহাড়বাসী। প্রথমবারের জন্য দার্জিলিং পালন করতে চলেছে তার নিজের ‘জন্মদিন’। শুনতে অবাক লাগলেও, এই দিনটিকে পাহাড়ের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা লগ্ন হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
১৮৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিকিমের চোগিয়াল বা রাজা একটি বিশেষ সনদে সই করে দার্জিলিংকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এমন উদ্যোগ। তবে এই জন্মদিন উদযাপন কেবল কেক কাটা বা উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর নেপথ্যে রয়েছে শহরের জনককে বিস্মৃতির আড়াল থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনার এক আন্তরিক প্রয়াস।
যাকে আধুনিক দার্জিলিংয়ের ‘আবিষ্কারক’ বলা হয়, সেই ব্রিটিশ আধিকারিক ক্যাপ্টেন জর্জ আইলমার লয়েড (Captain George Aylmer Lloyd) শুয়ে আছেন এই পাহাড়ের কোলেই। অথচ বড় অনাদরে, অবহেলায়। শহরের ১৮ নম্বর লেবং কার্ট রোডের পুরোনো সিমেট্রি বা কবরস্থানে আগাছার জঙ্গলে ঢাকা পড়ে আছে তাঁর সমাধি। জন্মদিন পালনের অংশ হিসেবে হতে চলেছে এক বিশেষ ‘সাফাই অভিযান’।
সমাজকর্মী পালজোর শেরিং ও অনন্ত শর্মার নেতৃত্বে শহরের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা ১ ফেব্রুয়ারি সেখানে সমবেত হবেন। কোদাল-কাস্তে হাতে তাঁরা পরিষ্কার করবেন ক্যাপ্টেনের জরাজীর্ণ সমাধি। আয়োজকদের কথায়, উৎসবের চেয়েও জরুরি হল শেকড়কে চেনা এবং সম্মান জানানো।
দার্জিলিংয়ের এই সৃষ্টিলগ্ন কিন্তু কম নাটকীয় নয়। একসময় এই ভূখণ্ড ছিল সিকিম রাজ্যের অন্তর্গত। সতেরোশো শতকে নেপাল আক্রমণ চালিয়ে তিস্তা নদী পর্যন্ত এলাকা দখল করে নেয়। এরপর ১৮১৪-১৬ সালের অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধ এবং সুগৌলির সন্ধির মাধ্যমে ব্রিটিশরা জমি পুনরুদ্ধার করে সিকিমকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু ১৮২৮ সালে ফের নেপাল-সিকিম বিবাদ বাধলে, মধ্যস্থতার জন্য ব্রিটিশ কোম্পানি দুই অফিসার- ক্যাপ্টেন লয়েড এবং জে ডব্লিউ গ্র্যান্টকে পাহাড়ে পাঠায়।
তাঁরা এসে পৌঁছান ঘুমের কাছে, যা তখন পরিচিত ছিল ‘ওল্ড গুর্খা স্টেশন’ নামে। পাহাড়ের এই নির্জন রূপ, কনকনে ঠান্ডা আর আকাশছোঁয়া সৌন্দর্য দেখে মোহিত হন লয়েড। সমতলে গরমে ধুঁকতে থাকা ব্রিটিশ সেনাদের জন্য এখানে একটি স্যানাটোরিয়াম বা স্বাস্থ্যনিবাস গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্নই আজকের পর্যটন নগরী দার্জিলিং। ১৮৪১ সাল থেকে সিকিমকে বার্ষিক ৩০০০ টাকা ভাতার বিনিময়ে এই জায়গা লিজ নেওয়া হয়, যা পরে বেড়ে ৬০০০ টাকা হয়েছিল।
ক্যাপ্টেন লয়েড এই শহরকে এতটা ভালোবেসেছিলেন যে, আমৃত্যু তিনি এখানেই থেকে যান। ১৮৬৫ সালে ৭৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! লয়েডের সমাধির ঠিক কয়েক হাত দূরেই রয়েছে বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান পণ্ডিত আলেকজান্ডার সিওমা ডি কোরোসের সমাধি। সেটি কিন্তু ঝকঝকে তকতকে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সেটাকে ‘জাতীয় গুরুত্বের স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। হাঙ্গেরির সরকার নিয়মিত টাকা পাঠায়, তাদের প্রতিনিধিরা এসে শ্রদ্ধা জানান। অথচ যাঁর হাত ধরে এই শহরের জন্ম, তাঁর সমাধিটিই স্থানীয় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে চলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা থেকে ইতিহাসপ্রেমীরা চাইছেন, কোরোসের সমাধির মতোই লয়েডের সমাধিকেও হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক। ঠিকঠাক সাজিয়ে তুলতে পারলে এটিও পর্যটকদের কাছে এক নতুন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। ১ ফেব্রুয়ারি, দার্জিলিংয়ের প্রথম জন্মদিনে তাই শহরের জনককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার শপথ নিতে চলেছেন পাহাড়বাসী।
