তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি অমল আচার্য তাঁকে ভালোবেসে উত্তমকুমার ডাকতেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর তৃণমূল স্তরে দলের কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক নিয়ে মুদির দোকান চালান দধিমোহন দেবশর্মা।
অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: একসময় ছিলেন প্রিয়রঞ্জনের প্রিয়পাত্র। আর এখন মাঠে নামার ডাক আর আসে না। তবে মোস্তাফানগর অঞ্চলের ভেউরের বাসিন্দা দধিমোহন দেবশর্মা (Dadhimohan Debsharma) মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, তিনি আবার রাজনীতির লাইমলাইটে ফিরে আসবেন।
জেঠু চরণ দেবশর্মার হাত ধরে ডানপন্থী রাজনীতিতে হাতেখড়ি। কলেজ না উতরালেও ছাত্রাবস্থায় কলেজে ছাত্র পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন দধিমোহন। এইড ফান্ডের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একসময়ের প্রিয়রঞ্জনের সেরা রাজনৈতিক ছাত্রটি রাজনীতিকেই ধ্যান, জ্ঞান করে নিয়েছিলেন। খাজিরুদ্দিন আহমেদ, মনোরঞ্জন লাহার মতো সেই সময়কার তাবড় তাবড় কংগ্রেস নেতার নেতৃত্বে আর দধিমোহনের হাত ধরে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ব্লক কংগ্রেস সম্পাদকের দায়িত্ব এবং কালিয়াগঞ্জ (Kaliaganj Information) পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষও হয়েছিলেন তিনি। পুরোনো সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে দধির মন্তব্য, ‘তখন প্রাণ ছিল রাজনীতিতে। বিরোধী রাজনৈতিক দল করেও তখন সম্মান ছিল যথেষ্ট।’
বামবিরোধী মুখ হিসেবে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর অগাধ বিশ্বাস জন্মায় দধিমোহনের মনে। ১৯৯৮ সালে মমতা কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল দল বানাতেই কংগ্রেস ছেড়ে জোড়াফুলের ঝান্ডা ধরেন দধিমোহনও। ২০০৮ সালে মোস্তাফানগর গ্রাম পঞ্চায়েতে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রথম তৃণমূলের প্রধান হয়েছিলেন এই দধিমোহনই। ২০১৮ সালে কালিয়াগঞ্জের একটি আসন থেকে জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পাশাপাশি, সাংগঠনিকভাবে তৃণমূলের ব্লক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে, জয়ী আসনে পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচনে আর দলের টিকিট পাননি। তাঁর আক্ষেপ, ‘জেতা আসনের বদলে উলটে বিজেপি অধ্যুষিত একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের আসনে আমার স্ত্রী পম্পা দেবশর্মাকে জোড়াফুলের টিকিট দেওয়া হয়েছিল। লড়াইও করেছিলাম। কিন্তু, সেবার দলের কিছু বিভীষণদের জন্য হারতে হয়।’ ২০১৬ সালের পর তৃণমূলে নবাগতদের আগমনে রাজনৈতিকভাবে খেই হারাতে শুরু করেন দধি। তৎকালীন তৃণমূলের জেলা সভাপতি অমল আচার্যের ঘনিষ্ঠ দধিমোহনকে ‘বুড়ো’, ‘পুরোনো’ তকমা দিয়ে দেন দলের কয়েকজন নেতা। একরাশ ক্লেশ বুকে নিয়ে ঘরমুখো হন দধি। এই মুহূর্তে উত্তর দিনাজপুর জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতির দায়িত্বে নাম কা ওয়াস্তে রয়েছেন দধিমোহন। জেলা মিটিংয়ে সেভাবে গুরুত্বও পান না। বাড়িতেই ছোটখাটো একটি মুদির দোকান খুলেছেন। সেখানেই সময় কেটে যায়।
রাজনীতিতে তাঁর কৃতী ছাত্ররা আজ গুরুর দিকে তাকানোর চেষ্টাও করেন না। সেইভাবে যোগাযোগও রাখেন না কেউই। তৃণমূল পরিচালিত উত্তর দিনাজপুর জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ নিতাই বৈশ্য অবশ্য আজও দধিমোহনের নাম করেন শ্রদ্ধার সঙ্গেই। বললেন, ‘উনি নমস্য ব্যক্তি। বাম রাজনীতি ছেড়ে তৃণমূলে আসার পর তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ওঁর মতো মানুষ রাজনীতির বাইরে, তা ভাবতেই পারি না।’ দধিমোহনের আরেক রাজনৈতিক শিষ্য হিরণ্ময় সরকার। তিনি এখন কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। তিনি আর তাঁর স্ত্রী রাজনীতির পাঠ যে দধিমোহনের থেকেই নিয়েছেন, সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তাঁরও কোনও কুণ্ঠা নেই।একসময়কার শিষ্যদের নিয়ে কথা বলতে চান না দধিমোহন। ঠাট্টার ছলে কেবল বলেন, ‘গান্ধাররাজ সুবলের হাড় দিয়ে পুত্র শকুনি যেমন পাশা খেলায় জিততেন। তেমনই, আমার মৃত্যুর পর অস্থি ভরা তাবিজ গলায় পরলে যে কেউ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবে।’
