- জয়ন্ত ঘোষাল
ঠিক কোন ভৌগোলিক সীমানায় ইন্ডিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর ভারত শুরু হচ্ছে? ঠিক জানি না। বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, ভূগোলের মন আছে। অথবা মনের ভূগোল। নীললোহিত একবার প্রত্যন্ত থেকে প্রত্যন্ততর গ্রাম খুঁজতে বেরিয়েছিল। দিকশূন্যপুরে। যেখানে দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে মানুষ থাকবে। সত্যিকারের ভয়ংকর একটা গরিব গ্রাম। যেমনটা মৃণাল সেন বা শ্যাম বেনেগলের ছবিতে একসময় দেখা যেত দুর্ভিক্ষ পীড়িত এক গ্রাম। নীললোহিত সেই গ্রাম খুঁজতে গিয়েও দিশেহারা হয়ে যায়।
গরিব সেই প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যেও রয়েছে জোতদার, জমিদার। বস্তিতে গরিব মানুষ আছে। অথচ দেখছি সেখানেও ডিশ অ্যান্টেনা। কলকাতা পার্ক সার্কাসের এই জুগ্গিঝুপড়ির মধ্যে ডিশ অ্যান্টেনা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে — এটা ভারত না ইন্ডিয়া?
এখন মনে হয় ভারত আর ইন্ডিয়ার বিভাজনটা অর্থনৈতিক বিভাজন নয়। শুধু অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে শ্রেণিতত্ত্বের বিষয় নয়। অর্থনীতির চেয়েও সংস্কৃতি ভারত আর ইন্ডিয়ার ধারণার মধ্যে লুকিয়ে আছে। নেহরু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন, সেইসময় তাঁর চারপাশে ছিল শিক্ষিত, উদার, অভিজাত এক ভারতীয় এলিট সমাজ। পাশ্চাত্য দর্শনের দ্বারা তাঁরা শিক্ষিত। সেইসময় যাঁরা খাটো ধুতি পরতেন, হয়তো বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির কোনও প্রবীণ শিক্ষক। মাথায় টিকি। অনেক সময় হয়তো মঙ্গলবার সংকট মোচনের মন্দিরে পুজো দিয়ে মাথায় বা কপালে একটা গেরুয়া তিলক কেটে ক্লাস নিতে আসেন। এহেন জনসমাজকে অভিজাত শিক্ষিতসমাজ মনে করতেন, এঁরা পিছিয়ে পড়া মানুষ। এঁরা সামন্ততন্ত্রের প্রতিনিধি। এঁরা যথার্থ আধুনিক ভারতীয় হয়ে উঠতে পারছেন না। এই সংঘাতটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ইংলিশ মিডিয়াম বনাম হিন্দি মিডিয়ামের শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে।
আজ সনাতন হিন্দুধর্ম আর তথাকথিত সেকুলারিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত অনভিপ্রেত। আসলে, ভারতীয় সনাতনী হিন্দুসমাজ কোনও কাউন্টার ন্যারেটিভ নয়। ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের আখ্যান নয়। আসলে সনাতন ভারত, হিন্দুধর্মের ভারত আর ইন্ডিয়ার মধ্যে কোনও সংঘাত নেই। ভারত নামক আইডিয়াটি একটা বহুত্ববাদী আইডিয়া।
ভারত নামটি ‘ভরত’ রাজার স্মৃতিচিহ্ন বহন করে। হিন্দু ইন্ডিয়া সিন্ধু সভ্যতার অতীত প্রেক্ষাপটকে সবসময় মনে করায়। তবু এই ইন্ডিয়া আর ভারতের ঝগড়া ক্রমশ ডালপালা মেলে বিস্তার লাভ করে। ভুলভাবে দেখার জন্য। রাজনৈতিক দলের আচরণ সবসময় ভোটকেন্দ্রিক। তাই প্রতিটি দল তার নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক তৈরি করতে উদ্যত। সেটা তার কেন্দ্র। ভোগবাদের অর্থনীতির ভাষায় উপভোক্তা তৈরি করা। আর এই উপভোক্তাবাদ ইন্ডিয়া আর ভারতকে আলাদা করতে শিখিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের একটা গল্প মনে পড়ছে। ইলাহাবাদ নগরীতে একটি স্কুল। সেই স্কুলে এসেছেন এক ইনস্পেকটর। তিনি ছাত্রদের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করছেন — তোমরা ‘রিভার’ কাকে বলে জানো? দেখি কেমন ইংরেজি শিখেছো? তো ছাত্ররা উত্তর দিতে সক্ষম হল। উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল রিভার হচ্ছে টেমস রাইজিং মিসিসিপি। তখন ইনস্পেকটর আবার প্রশ্ন করলেন নদীর উদাহরণ দাও। এবার তারা মাথা চুলকোচ্ছে। নদী কাহাকে বলে তাহা তো তারা জানে না। তখন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর তীরে বসিয়া সে বালক বলিল, সে নদী কাহাকে বলে জানে না। যদিও সে রিভার কাকে বলে জানে।
গোরা উপন্যাসে বিনয় গোরাকে জিজ্ঞাসা করছেন, কোথায় তোমার সেই ভারতবর্ষ? গোরা বুকে হাত দিয়া কহিল, ‘আমার এইখানকার কম্পাসটা দিনরাত যেখানে কাঁটা ফিরিয়ে আছে সেইখানে, তোমার মার্শম্যান সাহেবের হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ার মধ্যে নয়।…’ এরপর গোরা ব্যাখ্যা করছেন, ‘আমি পথ ভুলতে পারি, ডুবে মরতে পারি, কিন্তু আমাদের সেই লক্ষ্মীর বন্দরটি আছে – সেই আমার পূর্ণস্বরূপ ভারতবর্ষ–ধনে পূর্ণ, জ্ঞানে পূর্ণ, কর্মে পূর্ণ সে ভারতবর্ষ কোথাও নেই। আছে কেবল চারিদিকের এই মিথ্যেটা?… এই যেখানে আমরা পড়ছি, শুনছি, চাকরির উমেদারি করে বেড়াচ্ছি, দশটা-পাঁচটায় ভূতের খাটুনি খেটে কী যে করছি তার কিছুই ঠিকানা নেই, এই জাদুকরের মিথ্যে ভারতবর্ষটাকেই আমরা সত্য ব’লে ঠাউরেছি ব’লেই পঁচিশ কোটি লোক মিথ্যে মানকে মান বলে মিথ্যে কর্মকে কর্ম ব’লে দিনরাত বিভ্রান্ত হয়ে বেড়াচ্ছি– এই মরীচিকার ভিতর থেকে কি আমরা কোনোরকম চেষ্টায় প্রাণ পাব! আমরা তাই প্রতিদিন শুকিয়ে মরছি। একটি সত্য ভারতবর্ষ আছে- পরিপূর্ণ ভারতবর্ষ, সেইখানে স্থিতি না হলে আমরা কি বুদ্ধিতে কি হৃদয়ে যথার্থ প্রাণরসটা টেনে নিতে পারব না।’
নিজের সুদীর্ঘ মননজীবনের শেষদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এই “লক্ষ্মীর বন্দর”, “পূর্ণস্বরূপ” ভারতবর্ষের ধারণার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তাকে ভালোবেসেছিলেন। আবার এই দেশের অগণিত মূঢ়, ম্লান মানুষকে এই ‘‘পূর্ণস্বরূপ ভারতবর্ষে” পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। আর তাই ঘরে-বাইরে উপন্যাসের মাস্টার মশাইয়ের মুখ দিয়ে তিনি প্রশ্ন করিয়েছিলেন—” দেশ বলতে মাটি তো নয়, এই সমস্ত মানুষই তো।”
আসলে জাতি, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতা কোনটার সঙ্গে কোনটার বিরোধ নেই। বিরোধ বাধলে ইন্ডিয়া আর ভারতের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একদা ভারতবর্ষে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতি। ছোট-ছোট ছোট-ছোট গ্রাম। স্বয়ং শাসিত। সেই ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। ব্রিটিশ শাসককুল এল। সেই সুশীতল জলে যেন উত্তপ্ত লৌহ শলাকা প্রবেশ করল। জলটাও টগবগ করে ফুটতে লাগল। তার ফলে গ্রামীণ সমাজ পরিবর্তনের মুখে এল। রেল চালু হল। ডাক-তার ব্যবস্থা চালু হল। সংবাদপত্র এল। কী দ্রুত পরিবর্তন হল। স্বাধীনতা এল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চলে গেল। সামন্ততন্ত্রের বদলে জন্ম নিল পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের বিকাশ হল। তারপরে ১৯৯১ সালে আবার একটা ঝড় এল। আর্থিক উদারবাদের ঝড়। বাজার অর্থনীতির ঝড়। উপভোক্তাবাদের ঝড়। মধ্যবিত্ত সমাজ আরও বিকশিত হল। পঁচিশ-ত্রিশ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত হয়ে উঠল। তাদের উচ্চাশা-প্রত্যাশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হল। বিজ্ঞাপন শিল্প এল। আর এইসবের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেসের পতন আর বিজেপির উত্থান। অন্য আঞ্চলিক দলগুলির বিকাশ। সে হল রাজনৈতিক ইতিহাস। এসবের মধ্যে ইন্ডিয়া আর ভারত যেন সমান্তরালভাবে এগোতে থাকল।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই ‘পুঁইমাচা’ গল্পটির কথা মনে পড়ছে। সেই গল্পের ক্ষেন্তি তার ছোট বোনকে নিয়ে একটা শীর্ণকায় পুঁইচারা ভাঙা পাঁচিলের ধারে ছোট খোলা জমিতে পুঁতছিল। তাতে রোজ জল ঢেলে ছিল। তারপরে অধিক মাত্রায় ভোজনপটু ক্ষেন্তি যখন অনেক পুঁইশাকের জন্ম হল, তখন চলে গেল শহরাঞ্চলের একটা বাড়িতে। তার বিয়ে হল। পাত্রটির দ্বিতীয় বিবাহ। সংগতিসম্পন্ন। সিমেন্ট-চুন আর ইটের ব্যবসা আছে। কিন্তু সেখানে নিগৃহীতা হল। তারপরে বসন্ত রোগে ক্ষেন্তি মারা গেল। কিন্তু ক্ষেন্তি চলে যাবার পরেও সেই বাড়ির পুঁইমাচাতে অজস্র পুঁইশাক জন্মাল। সবুজ ডগাগুলো সুপুষ্ট। শুধু পুঁইমাচা দিয়ে উপচে পড়ছে ক্ষেন্তির স্মৃতি। পুঁইগাছের প্রতি ভালোবাসার আড়ালে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান বাৎসল্যের যে সকরুণ চিত্র সে ছিল ভারতের কাহিনী। বিভূতিভূষণের লেখা ভারতের কাহিনী। আজ ইন্ডিয়াতে সেদিনের ক্ষেন্তিরাও বাবাকে ড্যাডি বলে ডাকছে।
