জয় মণ্ডল, ডালাস: সময় কত নির্মম! ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে ইনজুরি টাইমে স্পেনের মিকেল মেরিনোর আচমকা গোলটা শুধু পর্তুগালকে ছিটকে দিল না, একটা গোটা প্রজন্মের আবেগে যবনিকা টেনে দিল (Cristiano Ronaldo)। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দুই চোখ বেয়ে তখন অঝোরে জল নামছে। গত দুই দশক ধরে যিনি নিজের দাপটে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন, যাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আর রেকর্ড ৯৭৬টি গোল, তাঁকে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটা ছাড়াই চিরবিদায় নিতে হল।
৪১ বছর বয়সি রোনাল্ডো ডালাসে স্পেনের বিরুদ্ধে পুরো নব্বই মিনিট মাঠে ছিলেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, তিনি বল ছুঁয়েছেন মাত্র ১৯ বার! শট নিয়েছেন তিনটি, আর সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন স্রেফ একটি। পর্তুগালের এই হারের পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। বিবিসি-র ফুটবল বিশ্লেষক ও প্রাক্তন ইংরেজ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটনের মতে, মার্টিনেজের এই ‘তোষণনীতিই’ পর্তুগালের বিদায়ের মূল কারণ। সাটনের চাঁছাছোলা আক্রমণ, ‘রোনাল্ডো মাঠে একজন দাদুর মতো খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। আজ ওর অবদান শূন্য। গঞ্জালো র্যামোসের মতো ফর্মে থাকা স্ট্রাইকারকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে মার্টিনেজ চরম লজ্জার কাজ করেছেন। শুধুমাত্র দলের মহাতারকাকে খুশি রাখার মাশুল দিল পর্তুগাল।’
পর্তুগালের বর্তমান দলটি ছিল প্রতিভায় ঠাসা। প্যারিস সাঁ জাঁ-কে লিগ জেতানো নুনো মেন্ডেজ, ভিতিনহা, জোয়াও নেভেসদের মতো তরুণ রক্তের পাশাপাশি ছিলেন প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ব্রুনো ফার্নান্ডেজ। তবু পর্তুগাল আটকে রইল সেই শেষ ষোলোর গণ্ডিতেই। সাটন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পর্তুগালের ইতিহাসে রোনাল্ডো সেরা ফুটবলার হতে পারে, কিন্তু একজন ম্যানেজারকে তো দলের স্বার্থে কঠোর হতে হবে।’ ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই অবশ্য পদত্যাগের ঘোষণা করেছেন কোচ মার্টিনেজ। তবে বিদায়বেলায় তিনি রোনাল্ডোকে আড়াল করেই বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো যা করেছে, তার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। ও ফুটবলের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইকন।’
রোনাল্ডোর এই বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো শেষ হয়ে গেল ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) বিতর্ক। লিওনেল মেসি বনাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো- এই দ্বৈরথ গত দেড় দশক ধরে ফুটবল সমর্থকদের আড়াআড়ি দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছিল। পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার মতো বিশ্বকাপ না থাকাটাই ছিল তাঁদের দুজনের একমাত্র শূন্যতা। ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে লিওনেল মেসি সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন। আর রোনাল্ডোর সামনে সেই দরজাটা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গেল। এই বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা যেখানে সাত, সেখানে রোনাল্ডোকে থামতে হল তিন গোলেই। তাঁর প্রাক্তন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড সতীর্থ ওয়েন রুনির কথায়, ‘ও একজন জিনিয়াস। ফুটবলকে রোনাল্ডো যা দিয়েছে, তা সত্যিই বিরল। কিন্তু সময় কাউকেই ছেড়ে কথা বলে না। ফুটবলের জন্য আজ এক বিষণ্ণ দিন।’
কিন্তু যাঁর বিদায় নিয়ে এত চর্চা, সেই রোনাল্ডো কী বলছেন? মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন তিনি। কণ্ঠে সেই চেনা দম্ভ আর আত্মবিশ্বাস, ‘আমি আমার সেরাটা দিয়েছি এবং অত্যন্ত পরিষ্কার বিবেক নিয়ে মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত আমি এখনই নেব না। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেব।’ সমালোচকদের অতীত মনে করিয়ে দিয়ে তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানো আসার আগে পর্তুগাল কোনও দিন কোনও ট্রফি জেতেনি। আমি দেশের হয়ে তিনটি বড় ট্রফি জিতেছি। আগামীকাল এক নতুন দিন, আর জীবন এভাবেই এগিয়ে যাবে।’
ফুটবল ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করেছেন। বিশ্বের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য নজির তাঁর। ২৭টি ম্যাচ, ১১টি গোল। কিন্তু নকআউটে সেই অর্থে তিনি কখনোই দলের ত্রাতা হয়ে উঠতে পারেননি। ২০০৬ সালে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপেই পর্তুগাল সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল, এরপর আর কখনোই নয়।
তবুও ডালাসের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক পর্তুগিজ সমর্থকের কথাই হয়তো আজ সারা বিশ্বের কোটি কোটি রোনাল্ডো-ভক্তের মনের কথা, ‘আমাদের আজ কাঁদার দিন নয়, বরং হাসিমুখে উদযাপন করার দিন। কারণ আমরা চোখের সামনে রোনাল্ডোকে খেলতে দেখেছি।’
ফুটবলের আঙিনায় হয়তো আরও কিছুদিন তাঁর দৌড় দেখা যাবে। হয়তো সৌদি আরবে বা অন্য কোনও লিগে। এমনকি ২০২৮ সালের ইউরো কাপেও তিনি খেলতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মহারণে সেই চিরপরিচিত ৭ নম্বর জার্সির দম্ভ আর স্পর্ধা আর কখনোই দেখা যাবে না। মুকুটহীন এক সম্রাটের এভাবেই নিঃশব্দ প্রস্থান ঘটল।

