সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, আটলান্টা: আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখা মানেই যেন হৃদযন্ত্রের এক কঠিন পরীক্ষা (Argentina Vs Egypt)! গ্যালারিতে বসে থাকা ফুটবল ভক্তদের হয়তো বারবার নিজেদের পালস রেট মাপতে হয়। চার বছর আগে কাতারেও ঠিক এমনটাই হয়েছিল। আর আটলান্টায় মিশরের বিরুদ্ধে যেন সেই চেনা রুদ্ধশ্বাস স্নায়ুচাপের নিখুঁত পুনরাবৃত্তি। গত ১৬ বছরে বড় কোনও টুর্নামেন্টে এই প্রথমবার প্রথমার্ধেই পিছিয়ে পড়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল। ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলের পর ৬৭ মিনিটে মোস্তাফা জিকোর গোলে যখন ব্যবধান ২-০ হল, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল চ্যাম্পিয়নদের বিদায়ঘণ্টা হয়তো বেজেই গেল।
এই অপ্রত্যাশিত আখ্যানের নেপথ্যে ছিলেন মিশরের গোলকিপার মোস্তাফা শোবেইর। কায়রোর আল আহলি ক্লাবের এই ২৬ বছরের গোলকিপার প্রথমার্ধেই লিওনেল মেসির পেনাল্টি এবং হুলিয়ান আলভারেজের মাটিঘেঁষা জোরালো শট রুখে দিয়ে বুঝিয়ে দেন, কেন তাঁকে আফ্রিকার পরবর্তী সেরা তারকা ভাবা হচ্ছে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে খেলা মিশরের গোলকিপার আহমেদ শোবেইরের সুযোগ্য পুত্র তিনি। এদিন তাঁর এমন পরাক্রম দেখার পর ইউরোপের প্রথমসারির ক্লাবগুলি নিশ্চিতভাবেই নড়েচড়ে বসবে।
মিশর দলের ট্যাকটিক্সও ছিল দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত। দ্বিতীয়ার্ধে ছয় ডিফেন্ডার নিয়ে জমাট রক্ষণভাগ সাজিয়ে আর্জেন্টিনাকে উইংয়ে খেলতে বাধ্য করে তারা। হাইসেম হাসান ও মহম্মদ সালাহর গতিকে কাজে লাগিয়ে ভয়ংকর সব প্রতি আক্রমণ শানায় ফারাওরা। এর মাঝেই আসে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ভিএআর বিতর্ক। জিকোর একটি গোলের বিল্ড আপে, নিজেদের অর্ধে বহু দূরে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে সামান্য ফাউল করেছিলেন মারওয়ান আতিয়া। ভিএআরের হস্তক্ষেপে সেই গোলটি বাতিল হওয়াটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই দুর্ভাগ্যজনক এবং প্রযুক্তির চরম অপব্যবহার। তবে হাল ছাড়েনি মিশর, ৬৭ মিনিটে জিকোর ওই দ্বিতীয় গোলটি প্রমাণ করে দেয় তাদের হার-না-মানা জেদ।
অন্যদিকে, মেসির পেনাল্টি মিস নিয়ে তখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশ্বকাপে আটটি পেনাল্টির মধ্যে চারটিতেই ব্যর্থ তিনি। এক আসরে দুইটি পেনাল্টি মিসের বিরল নজিরও এখন তাঁর নামের পাশে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পেনাল্টি আসলে টেকনিকাল নয়, সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক একটি ব্যাপার। মেসির ধীর গতির রানআপ এখন প্রতিপক্ষ সহজেই ধরে ফেলছে। কিন্তু পেনাল্টি মিসের এই হতাশা আর বিদায়ের শোকগাথা যখন লেখা হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই অধিনায়কের বাঁ পা যেন কম্পিউটারের ‘কন্ট্রোল-অল্ট-ডিলিট’ বোতাম টিপে মুহূর্তের মধ্যে সব মুছে দিল!
ম্যাচের শেষ লগ্নটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই অবিশ্বাস্য। ৭৯ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর জোরালো হেড থেকে আশা ফেরে আর্জেন্টিনার। আর ঠিক ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর ক্রসবার ছুঁয়ে আসা মেসির সেই অবিস্মরণীয় সমতাসূচক গোল। গ্যালারিতে তখন বাঁধভাঙা উল্লাস। এরপর লিয়ান্দ্রো পারেডেসের একটি মরিয়া ট্যাকল মিশরের নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেয়। আর ৯২ মিনিটে লওটারো মার্টিনেজের নিখুঁত ক্রস থেকে, ঠিক চেলসির হয়ে করা গোলের ঢঙেই এনজো ফার্নান্ডেজের সেই জয়সূচক হেড।
লিওনেল স্কালোনি ঠিকই বলেছিলেন, এই দলের মানসিক দৃঢ়তাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। খাদের কিনারা থেকে ঠিক এভাবেই বারবার ফিরে আসে আর্জেন্টিনা। এমন এক রুদ্ধশ্বাস স্নায়ুযুদ্ধের পর পুরো দেশের এখন সত্যিই একটু গা-এলিয়ে বিশ্রাম প্রয়োজন!

