উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: ক্রিকেট মাঠে হার-জিত থাকে, কিন্তু মাঠের বাইরের রাজনীতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ইদানীং যে খেলাটা খেলছে, তাকে এক কথায় ‘হাস্যকর’ বললেও কম বলা হয় (BCB vs BCCI)। খবরটা শুনেছেন নিশ্চয়ই? ভারতে নাকি বাংলাদেশ দল ‘নিরাপদ’ বোধ করছে না! তাই আসন্ন বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো তারা ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার আবদার জানিয়েছে আইসিসির কাছে। এখানেই শেষ নয়, রাগের চোটে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচারও নিষিদ্ধ করে দিয়েছে তারা (IPL broadcast ban in Bangladesh)।
ভেতরের খবর বলছে, এসবের মূলে রয়েছে ‘মুস্তাফিজুর রহমান ইস্যু’ (Mustafizur Rahman)। আইপিএল-এ মুস্তাফিজকে কেন্দ্র করে ঘটনায় বাংলাদেশের ইগোতে বড় চোট লেগেছে। আর সেই অভিমান থেকেই এই নজিরবিহীন কাণ্ড। সোজা বাংলায় বললে, বিষয়টা অনেকটা সেই পাড়ার ছেলের মতো—যে খেলায় সুযোগ না পেয়ে বলে, “আমি তো খেলবই না, আমার ব্যাটটাও কাউকে দেব না।” কিন্তু বাংলাদেশ ভুলে যাচ্ছে, বিশ্ব ক্রিকেটের এই বিশাল যজ্ঞে তাদের ‘ব্যাট’ বা উপস্থিতি ভারতের কাছে কতটা নগণ্য।
প্রথমে আসা যাক ‘নিরাপত্তা’র অজুহাত প্রসঙ্গে। ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে এসে পাকিস্তান যেখানে আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়, সেখানে বাংলাদেশ বলছে তারা নিরাপদ নয়! এটা যে শুধুই একটা পলিটিক্যাল স্টান্ট বা অজুহাত, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। মুস্তাফিজ ইস্যুতে তাদের আঁতে ঘা লেগেছে, তাই এখন পালটা চাপ সৃষ্টি করতে তারা ‘নিরাপত্তা’ কার্ড খেলছে। কিন্তু তারা কি একবারও ভেবেছে, এই আবদার আইসিসির কাছে কতটা হাস্যকর শোনাচ্ছে? লজিস্টিকস, ভেন্যু বুকিং আর ব্রডকাস্টিং শিডিউল কি ছেলেখেলা? চাইলেই সব তুলে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া যায়? বাংলাদেশ হয়তো ভাবছে তাদের এই ‘চাপ’ সৃষ্টিতে ভারত বিচলিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, বিসিসিআই বা ভারত সরকার—কারও হাতেই এত ফালতু সময় নেই যে, তারা এই নালিশ নিয়ে মাথা ঘামাবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। এটাকে বলা যায় ‘নিজেদের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গের’ ব্যর্থ চেষ্টা। বিসিবি হয়তো ভেবেছে, বাংলাদেশের বিশাল দর্শক আইপিএল না দেখলে ভারতের বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে। স্টার স্পোর্টস বা বিসিসিআই-এর রেভিনিউ ধসে পড়বে। কিন্তু অর্থনীতির অঙ্কটা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। আইপিএল-এর গ্লোবাল ভিউয়ারশিপ আর ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের বাজার সেখানে খুব সামান্য এক ভগ্নাংশ মাত্র। সত্যি বলতে, বাংলাদেশে খেলা দেখাল কি দেখাল না, তাতে আইপিএল-এর কোষাগারে এক পয়সারও হেরফের হবে না।
উলটো ক্ষতিটা কার হল? ক্ষতি হল বাংলাদেশের সাধারণ ক্রিকেটপাগল দর্শকদের। যারা সাকিব-লিটনদের বাইরে বিশ্বমানের ক্রিকেট দেখতে চায়, যারা টি-টোয়েনটির আসল বিনোদন চায়, তাঁদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল। আর কেন? শুধুমাত্র ক্রিকেট বোর্ডের কিছু কর্তার মিথ্যে ইগো আর জেদ বজায় রাখতে। ভারত বা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর এতে ‘থোড়াই কেয়ার’। তাদের স্পনসরশিপের লাইন লেগে আছে, টাকার ফোয়ারা ছুটছে। বাংলাদেশের এই বয়কট তাদের কাছে মশা কামড়ানোর মতোও মনে হবে না।
এবার একটু কড়া সত্যি কথা বলা যাক। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে বুঝতে হবে, তারা এখন আর ‘বাচ্চা’ নেই যে কান্নাকাটি করলেই লজেন্স জুটবে। মুস্তাফিজুর রহমান নিঃসন্দেহে ভালো বোলার, কিন্তু তাঁকে কেন্দ্র করে পুরো একটা দেশের ক্রিকেট কূটনীতি এভাবে লাইনচ্যুত হতে পারে না। আইপিএল বা ভারতীয় ক্রিকেট তাঁকে কতটুকু গুরুত্ব দিল বা দিল না, তার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বকাপের মতো আসরে ভেন্যু বদলানোর আবদার করাটা অপেশাদারিত্বের চরম নিদর্শন। এটা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে ‘কাঁদুনে শিশু’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, তার পেছনে ভারতের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। অবকাঠামোগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে আয়ের উৎস—সবকিছুতেই প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে। অথচ সেই ভারতের বুকেই বসে ভারতের বিরুদ্ধে এই মেকি নিরাপত্তার ধুঁয়া তোলাটা অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।
ভারত বা বিসিসিআই জানে, তাদের হাতে ক্রিকেটের লাটাই। তারা চুপচাপ সব দেখছে। কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, কারণ হাতির চলার পথে কে ঘেউ ঘেউ করল, তাতে হাতির কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশ যদি শেষমেশ জেদ ধরে ভারতে না খেলে, তবে ক্ষতিটা ভারতের হবে না, আইসিসিরও হবে না। ক্ষতিটা হবে বাংলাদেশের। হয়তো তাদের জায়গা পূরণ করে অন্য কোনও দল খেলবে, টুর্নামেন্ট যথারীতি জমজমাট হবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে একটি দেশ নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছিল।
চায়ের দোকানের আড্ডায় হয়তো ভারত-বিদ্বেষী কিছু কথা বলে হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে মেরুদণ্ড আর মগজ—দুটোই লাগে। শুধু আবেগের ফানুস উড়িয়ে আর টিভি চ্যানেল বন্ধ করে ভারতের মতো সুপারপাওয়ারকে ‘শিক্ষা’ দেওয়া যায় না। বাংলাদেশ যত তাড়াতাড়ি বুঝবে যে, তাদের এই ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার কৌশল পুরোনো হয়ে গেছে এবং এতে ভারতের কিছুই যায় আসে না, ততই তাদের জন্য মঙ্গল। নতুবা, বিশ্ব ক্রিকেটে একঘরে হয়ে, নিজেদের তৈরি করা এই ‘নিরাপত্তাহীনতার’ গর্তে তাদের নিজেদেরই পড়তে হবে।
দিনশেষে কথা একটাই—অভিমান করে ভাত না খেলে যেমন মায়ের বা বাবার শরীর খারাপ হয় না, উলটো নিজের শরীরই দুর্বল হয়; ঠিক তেমনি আইপিএল বন্ধ করে বা ভেন্যু বদলানোর বায়না ধরে ভারতের কিচ্ছু হবে না। মাঝখান থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট নিজেদের দেউলিয়াপনা আর হীনম্মন্যতাই বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে।
