তুষার দেব, দেওয়ানহাট: ভারতের কৃষি ও কৃষক দীর্ঘদিন থেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।
কৃষিকাজ ছেড়ে ভিন্ন পেশায় জীবিকা অর্জনের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এরমধ্যেও কোচবিহারের (Cooch Behar) ঘুঘুমারি রায়পাড়া এলাকার হোসনেয়ারা বিবি যেন উলটো পথের যাত্রী। ইচ্ছাশক্তি এবং অত্যানুধিক কৃষি প্রযুক্তিকে সম্বল করে চতুর্থ শ্রেণি পাশ বছর ৩৪-এর হোসনেয়ারা এখন সফল কৃষক হয়ে স্বাবলম্বী। তাঁর হাত ধরে পারিবারের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিববর্তন হয়েছে। শুধু কি তাই? হোসনেয়ারার কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার পিছিয়ে পড়া বহু মহিলা কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে পেয়েছেন আলোর দিশা। সবমিলিয়ে তিনি যেন নারী প্রগতির রোল মডেল। সেই হোসনেয়ারা শনিবার কলকাতায় ‘কৃষি অনন্যা’ পুরস্কার পেলেন (Krishi Ananya Award)। রাজ্যের পাঁচজন পুরস্কারপ্রাপকের মধ্যে কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গের মধ্যে তিনিই একমাত্র।
রাজ্যের কৃষি আধিকারিকদের সংগঠন স্টেট অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনলজিস্টস সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (সাটসা) ৭৫তম বার্ষিক সাধারণ সভা শনিবার কলকাতার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে হয়। ২০২৬-আন্তর্জাতিক নারী কৃষকবর্ষ উপলক্ষ্যে এবার উক্ত সংগঠনের তরফে রাজ্যের পাঁচ কৃতী মহিলা কৃষককে পুরস্কৃত করা হয়। তারমধ্যে একজন হোসনেয়ারা। আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে এদিন তাঁর হাতে মানপত্র, মেমেন্টো ও ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। কোচবিহার জেলা উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) অসিতবরণ মণ্ডল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। হোসনেয়ারাকে নিয়ে ফোনে উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেন তিনি। বলেন, ‘সংরক্ষণ কৃষির ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে হোসনেয়ারা নিজে এবং পার্শ্ববর্তী কৃষকদের লাভবান হতে উৎসাহিত করেছেন। তঁার পুরস্কারপ্রাপ্তি আমাদের কাছে ভীষণ গর্বের ও আনন্দের।’ প্রসঙ্গত, এই সংরক্ষণ কৃষি বা শূন্য কর্ষণে চাষ বলতে বোঝায়- একটি ফলনের পর বিনা কর্ষণ অর্থাৎ সেই জমি তৈরি না করে ফের ফসলের চাষ।
তবে হোসনেয়ারার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক কঠিন লড়াইয়ের ইতিহাস। নিজেদের সামান্য জমিতে চাষাবাদ ও স্বামীর দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে সংসার ঠিকমতো চলছিল না। এই পরিস্থিতিতে কৃষি দপ্তরের সহায়তায় তিনি ২০১৪ সালে যন্ত্রের মাধ্যমে শূন্য কর্ষণে গম চাষ শুরু করেন। প্রথমে লিজ ও নিজেদের মিলিয়ে মোট পাঁচ বিঘা জমিতে গম চাষে ৩৪ হাজার টাকা লাভ হয় তঁার। আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। শূন্য কর্ষণে চাষ করে ধান, ভুট্টা, পাট, সর্ষে চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন।
সরকারি সহায়তায় এলাকার স্বনির্ভর দলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে অ্যাগ্রি বিজনেস মডেলে ধানের বীজতলা তৈরির কারখানা চালু করেন। এসবের সঙ্গে বাড়িতে জিওল মাছ চাষ, মুরগি ও ছাগল পালন করছেন হোসনেয়ারা। কৃষিক্ষেত্র ও পশুপালন থেকে রোজগারের টাকায় সংসারে অভাব ঘুচে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।
এই ১২ বছরের মধ্যে তিনি আট লক্ষ টাকায় আট বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন, লিজে জমি নিয়েছেন, বাড়িঘরের কাজ করিয়েছেন। স্বামী মোফাজ্জল হোসেনকে বাইক কিনে দিয়েছেন। এছাড়াও দু’চোখে স্বপ্ন নিয়ে তিন মেয়েকে পড়াচ্ছেন। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে হোসনেয়ারার কর্মকাণ্ড আজ বিদেশেও প্রচারিত। রাজ্য কৃষি দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পাশাপাশি বিদেশের বহু প্রতিনিধি বহুবার তাঁর বাড়িতে এসেছেন। ২০১৮ সালে কোচবিহার-১ ব্লক কৃষি দপ্তরের তরফে ‘কৃষিকর্মন’, ২০১৯ সালে সাতমাইল সতীশ ক্লাবের তরফে ‘বেস্ট ফার্মার্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। ২০২০ সালে একটি নামী বেসরকারি সংস্থা তাঁকে জাতীয় স্তরে ২ লক্ষ ১১ হাজার টাকার অর্থমূল্যে পুরস্কৃত করে।
পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে? হোসনেয়ারা বলেন, ‘কী আর বলব! দু’চোখ দিয়ে জল আসছে। শুধু ভাবি, কোথায় ছিলাম, আর কোথায় এসেছি। কষ্টের দিন পেরিয়ে মাথার ওপর এখন ছাদ আছে, স্বামী-মেয়েদের নিয়ে দু’বেলা খেতে পারছি। ভবিষ্যতের জন্যও সঞ্চয় করছি।’ আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সাতমাইল সতীশ ক্লাব ও কোচবিহার-১ ব্লক তথা জেলার প্রাক্তন কৃষি অধিকর্তা (বর্তমানে আলিপুরদুয়ার জেলায় কর্মরত) রজত চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে উল্লেখ করেছেন তিনি।
