Cooch Behar | মেলা শেষ, ঘুমিয়েই রইল হেরিটেজ 

Cooch Behar | মেলা শেষ, ঘুমিয়েই রইল হেরিটেজ 

শিক্ষা
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

রাসমেলা (Rash Mela) শেষ। দোলায় চড়ে মদনমোহন চলে গিয়েছেন নিজের ঘরে। আপাতত রাসচক্র গোটানোর অপেক্ষা। মেলায় লাখে লাখে মানুষ এলেন, মজা করলেন, টমটম কিনলেন, জিলিপি খেলেন, কিন্তু শহরের গর্ব, তার ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি অন্ধকারেই পড়ে রইল। বিশাল দর্শকসমুদ্রকে কাজে লাগিয়ে কোচবিহারের (Cooch Behar) হেরিটেজকে ব্র্যান্ডিং-এর সুযোগ ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু যে সুযোগ আকাশে উড়ল, তাকে তো ধরার মতো প্রশাসনিক মইটিই পাওয়া গেল না। পুরসভা বা প্রশাসনের কর্তারা অবশ্য সে চেষ্টাও করেননি। বাহবা কুড়োনো আর রাজনীতি নিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিলেন তাঁরা।

ভিনরাজ্য, জেলা থেকেও রাসমেলায় হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন। তাঁরা যে শুধু মেলা ঘুরতে আসেন তা নয়, তাঁদের পরিকল্পনায় রথ দেখা, কলা বেচা দুটোই থাকে। তাঁরা রাসমেলা ঘোরার পাশাপাশি শহরের হেরিটেজ স্থাপত্যগুলিও দেখতে চান। তবে মদনমোহন মন্দিরের বাইরে বাস্তবে তাঁদের ভ্রমণ সীমাবদ্ধ থাকে কোচবিহার রাজবাড়ি আর সাগরদিঘির মধ্যেই। কারণ, অন্য স্থাপত্যগুলো কোথায় আছে, কীভাবে সেগুলো দেখা যাবে, কীভাবে যেতে হবে ইত্যাদি কিছুই দর্শনার্থীরা জানেন না। তাঁদের জানানোর ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। সেই কাজটাই করতে হত প্রশাসন, পুরসভা বা হেরিটেজ কমিটির। কিন্তু তাতে গোল্লা পেয়েছেন তাঁরা।

কোচবিহারের হেরিটেজ তো রত্নখচিত এক কাঠের বাক্সের মতো; জমকালো, আশ্চর্য, দেখলে মন ভরে যায়। কিন্তু সেই বাক্সটার তালা খোলার চাবিটাই এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না। দর্শনার্থীরা কেউ বললেন না, ‘রাসমেলায় এসেছিলাম, আর কোচবিহারের হেরিটেজের প্রেমে পড়ে গেলাম।’ প্রশাসন, পুরসভার এমন ব্যবস্থাপনা করা উচিত ছিল যাতে দর্শনার্থীরা সেকথা বলেন। দুর্ভাগ্য, রাস ছিল, রসদ ছিল, ছিল না শুধু ভাবনা।

ইচ্ছে থাকলে হতে পারত অনেক কিছুই। মেলার মাঠেই একটা জমকালো ‘হেরিটেজ কর্নার’ তৈরি করা যেত। হেরিটেজ গ্যালারি বানিয়ে সেখানে কোচবিহারের পুরোনো মানচিত্র, রাজপরিবারের বিরল ছবি, রাজাদের শিকার বিষয়ক দলিল, নানা স্থাপত্যের ইতিহাসের প্রদর্শনী হতে পারত। হেরিটেজ নিয়ে ছোট ভিডিও, ইতিহাস নিয়ে কুইজ – সবই করা যেত অবলীলায়। ‘কোচবিহার ভ্রমণ : কোথায় কী দেখবেন’ – এই ধরনের একটা ছোট বুকলেটও তৈরি করা যেত। সেটা বিনামূল্যে বা সামান্য টাকার বিনিময়ে বিলিও করা যেত। কোনও হেরিটেজ স্থাপত্যের আদলে সেলফি জোন তৈরি করে যুব সম্প্রদায়ের মনে হেরিটেজ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরির সুযোগও ছিল।

কোচবিহারে এনবিএসটিসি’র সদর দপ্তর। নিগমের চেয়ারম্যানও জেলার লোক। মেলার দিনগুলিতে বাছাই করা স্থাপত্য বা দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য স্বল্প টাকায় বিশেষ প্যাকেজ করতে পারত নিগম। দুর্গাপুজোতে প্যাকেজ করে বাস চালানো গেলেও রাসমেলায় কেন করা গেল না তা বোধগম্য হল না। শুধু কোচবিহার শহর নয়, বাসে বাণেশ্বর থেকে গোসানিমারি সারাদিনে সবই ঘুরিয়ে দেখানো যেত। পর্যটক টানতে গাইডের মাধ্যমে কোচবিহারের ইতিহাস সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য জানিয়ে ভবিষ্যৎ পর্যটনকেও সমৃদ্ধ করা যেত।

নিউ কোচবিহার রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা মেলায় ঢোকার কোনও অংশে পর্যটক সহায়তাকেন্দ্র তৈরি করে উৎসাহী পর্যটকদের সহায়তা করার ব্যবস্থা করতে পারত পর্যটন দপ্তর। শান্তিনিকেতন বা বিষ্ণুপুরে টোটোচালকরাই প্যাকেজ হিসাবে পর্যটকদের স্থানীয় স্থাপত্য বা দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখান। একইভাবে রাসের কয়েকদিন বা বছরের অন্য সময়ও টোটোচালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোচবিহারের হেরিটেজ গাইড হিসাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সেসব নিয়ে উদ্যোগ চোখে পড়ল না।

রাসমেলা চত্বরেই রয়েছে পূর্ত দপ্তরের সাজানো-গোছানো একটি অসাধারণ সংগ্রহশালা। আর একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা রয়েছে মেলা থেকে কয়েকশো মিটারের মধ্যেই কোচবিহার রেলস্টেশন চত্বরে। সেটি রেলের। দর্শকের অভাবে দুই সংগ্রহশালাতেই ধুলো জমেছে। রাসমেলায় আসা পর্যটকদের সেই সংগ্রহশালা ঘুরে দেখানোর ব্যবস্থা করা যেত। তাতে কোচবিহার সম্পর্কে আকর্ষণ বাড়ত। তারজন্য কাঠখড় পোড়ানোর দরকার ছিল না। মেলায় দিনরাত চলতে থাকা বিজ্ঞাপনী প্রচারের মাঝে খানিকটা সময় সংগ্রহশালা ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানালেই হয়ে যেত। সেই অতি সামান্য কাজটুকুও করতে পারেনি প্রশাসন। অতিথিরা দরজা থেকে ফিরে গেলেও তাদের আপ্যায়নের সোনার সুযোগ হাতছাড়া করলেন নীতি নির্ধারক মহোদয়গণ।

কোচবিহারে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ না থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময় গুরুগম্ভীর আলোচনা হয়। কিন্তু রাসমেলাকে ব্যবহার করে কোচবিহারের পর্যটনের প্রসার ঘটিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করার কথা ভাবে না প্রশাসনের কর্তা থেকে জনপ্রতিনিধি কেউই। প্রতিবছরই মেলা থেকে নানা গল্প নিয়ে মানুষ বাড়ি ফেরেন, কেউ বলেন চপের স্বাদের কথা, কেউ বলেন নাগরদোলা ভীষণ উঁচু, কেউ মজে থাকেন টমটম গাড়ির নস্টালজিয়ায়। কিন্তু কেউ বলেন না, ‘ভিক্টর প্যালেস দেখে এলাম’ বা ‘কোচবিহারের ইতিহাস জানলাম।’ কোচবিহারের জন্য এটা বেদনার।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *