নয়ারহাট: বাবা-মাকে আগেই হারিয়েছেন। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিলেন দাদা পঙ্কজ বর্মন। বটবৃক্ষের মতো ভাইকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। সিভিক ভলান্টিয়ার পঙ্কজের সামান্য উপার্জনে কোনওরকমে দুই অবিবাহিত ভাইয়ের পেট চলছিল। সিভিক ভলান্টিয়ারের আকস্মিক মৃত্যুতে দিশেহারা ভাই সংকোচ বর্মনের (৩০)।
এদিন সকাল থেকেই দোলাপাড়ায় মৃত সিভিক ভলান্টিয়ারের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমেছে। সবার চোখের কোণেই জল চিকচিক করছিল। চোখের জল মুছতে মুছতে এক আত্মীয় বলছিলেন, মায়ের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের আগেই ভাইকে একা করে পঙ্কজ চলে গেল! ছোট ভাই অনাথ হয়ে গেল।
শিলিগুড়ির ডাবগ্রাম ১২ ব্যাটালিয়নে বিভাগীয় প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে সোমবার ভোরে সেখানেই সিভিক ভলান্টিয়ার পঙ্কজ বর্মনের (৩৪) মৃত্যু হয়। দাদাকে হারিয়ে কূলকিনারা পাচ্ছেন না সংকোচ। কীভাবে দিন চলবে, কে খেয়াল রাখবে, পরামর্শই বা দেবে কে, ভেবে পাচ্ছেন না সংকোচ।
পঙ্কজ-সংকোচদের বাড়ি নয়ারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের খাগড়িবাড়ির বড়দোলায়। মাথাভাঙ্গা থানায় কর্মরত ছিলেন পঙ্কজ। পাড়ার ছেলের এমন মৃত্যুতে থ-বনে গিয়েছেন প্রতিবেশীরা। ঘটনায় শোরগোল পড়েছে এলাকায়। মাথাভাঙ্গা থানার পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।
পাঁচদিনের প্রশিক্ষণে যোগ দিতে রবিবার শিলিগুড়ির ডাবগ্রাম ১২ ব্যাটালিয়নে পৌঁছেছিলেন পঙ্কজ। সেখান থেকে যে আর ফিরে আসবেন না তিনি তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি পাড়াপ্রতিবেশীরা। এদিন ভোরে পঙ্কজের ঘটনাটি জানানো হয় নয়ারহাটে পঙ্কজের বাড়িতেও। খবর পেয়ে একমুহূর্ত দেরি করেননি তাঁর ভাই। সংকোচ কয়েকজন প্রতিবেশীকে নিয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। এদিন উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর দেহ ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফোনে যোগাযোগ করা হলে ভেজা গলায় সংকোচ বলেন, ‘এবার কাকে নিয়ে বাঁচব? কীভাবেই বা দিন চলবে? দাদা বলে ডাকলে আর সাড়া দেওয়ার কেউ থাকল না, মুহূর্তের মধ্যে কী যে হয়ে গেল!
এদিন ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে কার্যত শোকস্তব্ধ ছিল গোটা এলাকা। প্রতিবেশী অজিত রায়ের বক্তব্য, ‘দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়নি। বেতনের টাকায় দুই ভাইয়ের কোনওরকমে দিন চলত। বছর তিনেকের ব্যবধানে
বাবা-মাকে হারিয়ে দুজনে টেনশনে ভুগছিলেন। দাদার উপার্জনেই নির্ভরশীল সংকোচ। তাঁর দিন কীভাবে চলবে, ভেবে পাচ্ছি না।’
পঙ্কজের বাবা পরমেশ্বর বর্মন প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ক্যানসারে মারা যান। মা রেণুকাও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে আট মাসে আগে মারা যান। কয়েক বিঘা জমি ছিল। বাবা-মায়ের চিকিৎসায় সব জমি বিক্রি করে দুই ভাইয়ের সর্বস্বান্ত দশা। প্রতিবেশী ধনঞ্জয় বর্মন বলছিলেন, ‘ভালো ছেলে হিসাবে পঙ্কজের পরিচিতি ছিল। তাঁর এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁর ভাইও চরম সংকটে পড়ল।’ পরপর প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সংকোচ কীভাবে সহ্য করবেন, সেটাই আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কুরে-কুরে খাচ্ছে।
