Cooch Behar | বকুনি খেয়ে ঘর ছাড়ল পাঁচ বান্ধবী! কোচবিহারের ঘটনায় মাথায় হাত পুলিশের

শিক্ষা
Spread the love


শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: ‘আয় তবে সহচরী, হাতে হােত ধরি ধরি/নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এই গান লিখেছিলেন, তখন তিনি সদ্য নাবালকের গণ্ডি পেরিয়ে সাবালকত্বে পা দিয়েছেন। প্রায় দেড়শো বছর আগে লেখা ওই গানে সহচরী অর্থাৎ বান্ধবীদের আহ্বান করা হয়েছিল হাতে হাত ধরে নাচ-গান-আনন্দে মেতে ওঠার। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন সহচরীরা শুধু নাচ-গান-আনন্দে মেতে ওঠার সঙ্গীই নয়, বরং একজনের বাড়িতে বকাঝকা করলে গোটা বান্ধবীর দলই একসঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে! কোচবিহারের (Cooch Behar) পাঁচজন ‘সহচরী’র ঘটনায় দুঁদে পুলিশ আধিকারিকদেরও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। অবশ্য বাড়ি থেকে পালিয়েও লাভ হয়নি। থানায় বসিয়ে চিঁড়েভাজা আর কোল্ড ড্রিংকস খাইয়ে তাদের বাড়ি পাঠায় পুলিশ। ততক্ষণে অবশ্য নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অঝোর ধারা বইছে পাঁচ বান্ধবীর চোখ দিয়ে।

যে বান্ধবীদের নিয়ে কথা হচ্ছে তারা প্রত্যেকেই শীতলকুচির ছোট শালবাড়ির বড় গদাইখোড়া ভিএম হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। নিজেদের মোবাইল না থাকলেও কেউ বাবার, আবার কেউ মায়ের মোবাইল নিয়েই মত্ত। মোবাইলের প্রতি আসক্তি থাকায় প্রত্যেকেই বাড়িতে বকাঝকা খেত। কিন্তু সমস্যা বাড়ল দিনকয়েক আগে থেকে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়লে কী হবে, মোবাইল সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় তাদেরই একজন নাকি ‘প্রেমের সম্পর্কেও’ জড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে বকুনির পরিমাণ বেড়ে যায় অনেকটাই। বাড়ির বকুনি ভালো না লাগায় ওই নাবালিকা ঠিক করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে? জানে না। ওই বান্ধবীর পাশে দাঁড়াতে বাকি চারজনও বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন পরিকল্পনা, তেমনই কাজ।

মঙ্গলবার প্রত্যেকেই স্কুলের ব্যাগে নিজেদের আলাদা পোশাক ঢুকিয়ে নেয়। বাড়ি থেকে কিছু টাকাপয়সা ও মোবাইল নিয়ে স্কুলের উদ্দেশে রওনা দেয় তারা। স্কুলে না গিয়ে বাসে উঠে সোজা চলে আসে কোচবিহার শহরে। দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে বিকেলের দিকে তাদের মাথায় আসে রাতে থাকবে কোথায়? একটি টোটোয় উঠে তারা প্রথমে নিউ কোচবিহার রেলস্টেশনে যেতে চায়। আবার আরেক বান্ধবী টোটোওয়ালাকে বলে একটি ভাড়াবাড়িতে নিয়ে যেতে। ততক্ষণে ‘ডাল মেঁ কুছ কালা হ্যায়’ তা বিচক্ষণ টোটোওয়ালার বোঝা হয়ে গিয়েছে। তাই তিনি কায়দা করে কিছুটা দূরে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কাছে নিয়ে যান ওই পাঁচ বান্ধবীকে। সেখান থেকে খবর যায় কোতোয়ালি থানায়। এরপর তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। খবর দেওয়া হয় প্রত্যেকের বাড়িতে। রাতেই কোতোয়ালি থানায় এসে হাজির হন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের হাতে নাবালিকাদের তুলে দেওয়া হয়েছে। তার আগে থানায় বসিয়ে নাবালিকাদের কাছ থেকে তাদের এই কাহিনী শোনেন আধিকারিকরা। তারা যে অনেক বড় ভুল পদক্ষেপ করতে চলেছিল তা বোঝানো হয়। ততক্ষণে হাউমাউ করে কান্না জুড়েছে নাবালিকারা।

এক নাবালিকার মায়ের কথা, ‘হঠাৎ দেখি বাড়িতে মোবাইল নেই। ফোন করে দেখলাম সুইচড অফ। স্কুল থেকে মেয়ে বাড়িতে না ফেরায় পুলিশের কাছেও গিয়েছিলাম। পরে খবর পাই কোচবিহারে পাওয়া গিয়েছে।’ একই সুরে আরেক নাবালিকার মাসি বললেন, ‘পাঁচজন বান্ধবী একসঙ্গে এরকম কাণ্ড ঘটাবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।’ ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিতকুমার রায় বলেছেন, ‘ছাত্রীরা এরকম কাণ্ড ঘটিয়েছে জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি।’

অল্পবয়সিদের মধ্যে এরকম ঘটনায় উদ্বেগে মনোবিদরাও। এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিরঞ্জীব রায়ের কথায়, ‘ছাত্রছাত্রীরা কীরকম আচরণ করবে তার অনেকটাই বাড়ির পরিবেশের উপর নির্ভর করে। কড়াভাবে বকাঝকার বদলে ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে মনের খোঁজ রাখতে হবে।’

‘হাতে হােত ধরি ধরি’ করে একসঙ্গে নিরুদ্দেশের উদ্দেশে বের হলেও শেষপর্যন্ত থানার চিঁড়েভাজা আর কোল্ড ড্রিংকসের আতিথেয়তাতেই নাটকের যবনিকা পড়ে। তবে টোটোওয়ালার সতর্ক নজর না থাকলে ‘সহচরী’দের গল্পটা বিপজ্জনক হতে পারত বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *