মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়, হিউস্টন: ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের বিমানে হিউস্টনে নামতেই একটা অন্যরকম শিহরণ অনুভব করলাম। চারপাশে ফুটবলের উন্মাদনা, কিন্তু আমার হৃৎস্পন্দন যেন একটু বেশিই দ্রুত- কারণ, সোমবার রাউন্ড অফ ৩২-এ মুখোমুখি হচ্ছে আমার চিরকালের ভালোবাসার দেশ ব্রাজিল এবং নিখুঁত ফুটবল-মেশিন, আমাদের এশিয়ার দেশ জাপান। হৃদয় এবং মস্তিষ্ক দুই-ই বলছে এই লড়াইয়ে এগিয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়াররা (Vinicius Junior), কিন্তু হিউস্টনের এই ফুটবল-বাতাসে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, পরিসংখ্যানের বাইরেও ফুটবলের এক নিজস্ব কাব্য আছে।
এমনিতেই শিকড়ের টান আর পেশাদারিত্বের অদ্ভুত এক দোলাচল। একদিকে নিজের মাতৃভূমি, জন্মদাত্রী ব্রাজিল, অন্যদিকে নিজেরই হাতে তিলতিল করে গড়ে তোলা ফুটবল-সাম্রাজ্য জাপান। সোমবার রাউন্ড অফ ৩২-এর সবুজ গালিচায় যখন এই দুই দেশ একে অপরের মুখোমুখি হবে, তখন কিংবদন্তি জিকোর (Zico) হৃদয়ে যে এক অদ্ভুত রক্তক্ষরণ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আবেগ সরিয়ে রেখে ‘ও গালিনহো’ স্পষ্টই জানাচ্ছেন, ‘আমি ব্রাজিলীয়, তাই ব্রাজিলেরই জয় চাইব। কিন্তু জাপান জিতলেও আমার আক্ষেপ থাকবে না, কারণ ওরা এখন নিখুঁত ফুটবল খেলতে শিখে গিয়েছে।’
ফুটবলের এই দুই ভিন্ন মেরুর লড়াই জিকোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কুড়ি বছর আগের এক নস্টালজিয়ায়। ২০০৬ বিশ্বকাপে যখন এই দুই দেশ শেষবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন জাপানের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে স্বয়ং জিকো। স্মৃতির সরণি বেয়ে কিংবদন্তি বলছিলেন, ‘ম্যাচের আগে ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত গেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কিক অফের পর থেকে আমি আদ্যোপান্ত জাপানি হয়ে যাই। মনটা খুব ছটফট করছিল।’ সেবার প্রথমার্ধের ঠিক আগে রোনাল্ডোর সেই হেডে গোল হজম করার স্মৃতি আজও তাঁকে হাসায়। রসিকতা করে জিকো বলেছেন, ‘রোনাল্ডো (Ronaldo Nazario) নাকি আমাকে আইডল মানে, অথচ জীবনে ওই একটাই হেডে গোল করল, আর সেটাও কি না আমার দলের বিরুদ্ধেই!’
তবে সেদিনের সেই আবেগপ্রবণ আর ভঙ্গুর জাপান আজ আর নেই। জিকোর মতে, ব্লু সামুরাইরা এখন শুধু কৌশলগতভাবেই নয়, মানসিকভাবেও এক ইস্পাতকঠিন প্রাচীর। বিশ্বকাপের ২৬ জনের দলে ২৩ জনই বুন্দেশলিগা, প্রিমিয়ার লিগ বা সিরি-এ-র মতো ইউরোপীয় লিগগুলোয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ঘরোয়া লিগ থেকে সুযোগ পাওয়া মাত্র তিনজনের মধ্যে একজন হলেন পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে আসা অভিজ্ঞ ইউতো নাগাতোমো, যিনি দলে রয়েছেন এক যোগ্য নেতার ভূমিকায়। জিকোর মতে, একসময় গোল হজম করলেই যে জাপান খেই হারিয়ে ফেলত, তারা আজ যে কোনও পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। বিগত কয়েক বছরে জার্মানি, স্পেন বা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দেশগুলোকে মাটিতে নামিয়ে এনে তারা প্রমাণ করেছে, প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, সামুরাইদের তরবারি এখন সবসময়ের জন্য শানিত।
এই মহারণের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হল দুই কোচের লড়াই-কার্লো আনসেলোত্তি (Carlo Ancelotti) এবং হাজিমে মোরিয়াসু (Hajime Moriyasu)। জিকোর স্মৃতির ঝুলি থেকে জানা গেল, এই দুজনই খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন টেকনিকসম্পন্ন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, যাঁরা ফুটবলের নিখুঁত সমীকরণগুলো চমৎকার পড়তে পারতেন। তাই হিউস্টনের মঞ্চে রণকৌশলের লড়াইটা যে হতে যাচ্ছে হাইভোল্টেজ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সব মিলিয়ে এই লড়াই শুধু দুটো দেশের নয়, এ যেন জিকোর ফেলে আসা অতীত আর বর্তমানের এক মায়াবী সংঘাত। একদিকে লাতিন আমেরিকার আবেগী সাম্বা, আর অন্যদিকে নিখুঁত শৃঙ্খলায় মোড়া প্রাচ্যের সামুরাই। ফুটবলের এই মহাকাব্যিক রাতে জিকোর হৃদয়ের এক অংশ যেমন হলুদ জার্সির জন্য গলা ফাটাবেন, ঠিক তেমনি আরেক অংশ হয়তো নীল সামুরাইদের অদম্য লড়াই দেখে নিঃশব্দে তৃপ্তির হাসি হাসবেন।

