বক্সিরহাট: দুজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণীর ভালোবাসার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিয়ে করবেন বলে চারদিন আগে ঘর ছেড়েছেন তাঁরা। আর সেটাই মেনে নিতে পারেননি ওই তরুণীর ‘তৃণমূল নেতা’ বাবা। ক্ষমতার দম্ভে বৃহস্পতিবার তিনি কার্যত তাণ্ডব চালান মেয়ের প্রেমিকের বাড়িতে। অভিযোগ, বাড়িতে চড়াও হয়ে প্রেমিকের বাবা-মাকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে এসে বেধড়ক মারধর করা হয়। বর্তমানে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তরুণের বাবা। ঘটনাটি তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের ফলিমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের। বিকেলে ওই তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে বক্সিরহাট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে প্রেমিকের পরিবার। এদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বিকেলে ফলিমারি-রামপুর সংযোগকারী রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান এলাকাবাসী। পরে পুলিশের তরফে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। যদিও এই ঘটনায় ওই তৃণমূল নেতা গোকুল সাহার সাফাই, ‘আমি শুধু ওঁদের মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। মারধরের কোনও ঘটনা ঘটেনি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এনে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তুফানগঞ্জের এসডিপিও কান্নেধারা মনোজ কুমার বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।’
ভালোবাসার সম্পর্কে ফলিমারি অঞ্চলের তৃণমূলের সভাপতি গোকুল সাহার এহেন দাদাগিরিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার মানুষজন। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই তোপ দেগেছে বিজেপি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই শাসক নেতার প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে প্রতিবেশী জিতেন্দ্র সাহার ছেলের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবার থেকে এই সম্পর্কের স্বীকৃতি মিলবে না আশঙ্কায় চারদিন আগে দুজনেই ঘর ছাড়েন। বিষয়টি জানাজানি হতেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে এলাকায়। মেয়েকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে টানা দু’দিন ধরে প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে হুমকি ও চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এদিন আত্মীয়স্বজন ও দলবল নিয়ে প্রেমিকের বাড়িতে চড়াও হন অভিযুক্ত গোকুল সাহা। সেখান থেকে তরুণের বাবা ও মা-কে চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় টেনে এনে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। লাথি-ঘুসিতে গুরুতর জখম হন দুজনেই। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, মারধরের জেরে তরুণের বাবার পা ভেঙে গিয়েছে। গুরুতর জখম অবস্থায় আক্রান্তকে প্রথমে রামপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্ত প্রেমিকের বাবা জিতেন্দ্র বলেন, ‘একদিনের মধ্যে মেয়েকে হাজির না করালে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এদিন আচমকা দলবল নিয়ে চড়াও হয়ে বাড়িতে ঢুকে আমাদের রাস্তায় টেনে এনে মারধর করা হয়।’ ঘটনায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে বক্সিরহাট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন আক্রান্তের ছোট ছেলে সৌরভ সাহা। তিনি বলেন, ‘ওই নেতা দলবল নিয়ে এসে বাবা-মাকে নির্মমভাবে মারধর করেছেন। বর্তমানে বাবা হাসপাতালে ভর্তি। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবিতে আমি থানার দ্বারস্থ হয়েছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ঝর্ণা দাস বলেন, ‘শাসকদলের নেতা বলেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ায় যেত। আমরা ওই নেতার পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে শাসক নেতার দাদাগিরির ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক তর্জা শুরু হয়েছে। এই ব্যাপারে বিজেপির জেলা সহ সভাপতি উৎপল দাস বলেন, ‘‘রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। শাসকদলের নেতারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবছেন। প্রেম করার ‘অপরাধে’ এক পরিবারকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হচ্ছে-এটাই বর্তমান শাসনের আসল চেহারা। আমরা নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চাই।’’ তৃণমূল কংগ্রেসের তুফানগঞ্জ-২ ব্লক সভাপতি নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব। তবে বিরোধীরা সব বিষয়েই রাজনীতি খোঁজে।’
