উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে কলকাতার এজেসি বোস রোডে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট (Alimuddin Avenue) সংলগ্ন এলাকা এক নজিরবিহীন ছবির সাক্ষী থাকল। ‘রিপাবলিক পার্টি অফ ইন্ডিয়ার’ উদ্যোগে এবং নিজেদের সনাতনী হিন্দু হিসেবে পরিচয় দেওয়া একদল মানুষের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার সিপিএমের রাজ্য সদর দপ্তরের সামনে মাইক বেঁধে চণ্ডীপাঠের (Chandipath at Alimuddin Avenue) আয়োজন করা হয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, বাম নেতৃত্বের মনে জমে থাকা পাপ ক্ষালন করতেই এই ধর্মীয় আয়োজনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। আয়োজক দলের এক সদস্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যখন কেউ কোনও পাপ করে তখন সে জানে না পাপ করছে নাকি পুণ্য করছে। কারণ, তাদের মনে যে পাপ সঞ্চয় হয়েছে তা খণ্ডন করতে আমরা শ্রী শ্রী চণ্ডীর মহামন্ত্র মাইক বাজিয়ে তাদের কানের গোড়ায় করছি। এই চণ্ডীপাঠের মন্ত্র তাদের কানের ভিতর ঢুকবে, আমার বিশ্বাস তাঁরা তাঁদের পাপ থেকে মুক্ত হবে।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম বক্তা সত্যজিৎ দাস আলিমুদ্দিনের রাজনৈতিক ইতিহাসকে টেনে মন্তব্য করেন, “আজ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে, সিপিআই(এম)-এর পার্টি অফিসের পাশে, হিন্দু ধর্মগুরুদের উপস্থিতিতে চণ্ডীপাঠের এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার মাটিতে সনাতন ধর্মের সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের এক দৃঢ় প্রকাশ ৷ যে আলিমুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বাংলার হিন্দু বিরোধী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র, আজ সেই আলিমুদ্দিনের পাশেই আমরা বলতে চাই— বাংলার সংস্কৃতি কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয় ৷ সনাতন ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা এবং আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য কোনও বামপন্থীদের রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে না ৷”
রাজনৈতিক চত্বরে এমন অভিনব প্রতিবাদ বা উদ্যোগকে একেবারেই পাত্তা দিতে নারাজ সিপিআই(এম) শীর্ষ নেতৃত্ব। পশ্চিম বর্ধমানের রানীগঞ্জে দলীয় বৈঠকে ব্যস্ত থাকায় সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সংক্ষেপে জানান, “যাঁরা করছেন তাঁদের বিষয়। গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। বাকি কথা ঘটনাস্থলে উপস্থিত নেতারা বলবেন।” অন্যদিকে প্রবীণ বাম নেতা সুজন চক্রবর্তী বিষয়টি নিয়ে বেশ হালকা মেজাজেই প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “ওদের প্রয়োজন মনে হয়েছে তাই করেছে। কার কী আসল-গেল। ওদের কাজ কম যদি থাকে, আর মনে হয় চণ্ডীপাঠ করাই একমাত্র কর্তব্য, এটা রাস্তার উপর করা যায়। কার কী এসে যায়? আমাদের কিছুই এসে যায় না। আর চণ্ডীপাঠ রোজ করা ভালো।” একই সুরে তরুণ বাম নেতা কলতান দাশগুপ্ত বলেন, “গোটা জেন জি বিজেপির কানে এমন মন্ত্র ভরে দিয়েছে যে বিজেপি বাস্তব আর স্বপ্নের ফারাক ভুলে গেছে। আর ধর্মাচরণ যে কেউ করতে পারেন। কিন্তু আলিমুদ্দিন বলে AJC বোস রোডে কেন করছে জানি না। আমাদের গেটে ধর্মবিদ্বেষী মানুষ বাদে সকলেই স্বাগত।”
এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাদানুবাদের পেছনে রয়েছে সম্প্রতি রাজ্য রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া কিছু উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহ। গত ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari) কড়া সুরে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, শারদীয় উৎসবে বইয়ের স্টলগুলোতে ‘শারদোৎসব’ লেখা থাকলে তা বসতে দেওয়া হবে না, স্টলে স্পষ্টভাবে ‘দুর্গাপুজো’ শব্দটিই ব্যবহার করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী পাল্টা দাবি করেন, মূল সংঘাত শব্দের ব্যবহার নিয়ে নয়, বরং বইয়ের স্বাধীন বিপণন ও মুক্তচিন্তার প্রকাশ থামানোই আসল লক্ষ্য। উদ্ভূত বিতর্কের মধ্যেই রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে আলিমুদ্দিনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে একটি বিশেষ শারদীয় পোস্টার সাঁটিয়েছে সিপিএম, যেখানে লেখা রয়েছে— “সাম্প্রদায়িক, জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবিদ্বেষীরা ছাড়া সবাই স্বাগত ৷ শুভ শারদীয়া ৷”
শুধু চণ্ডীপাঠই নয়, এদিন এজেসি বোস রোডে অবস্থিত সিপিএমের মুখপত্র ‘গণশক্তি’ দপ্তরের ঠিক পাশে নাগরিক মঞ্চের ব্যানারে এক হাইপ্রোফাইল কনভেনশনের আয়োজন করা হয়। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় আয়োজিত বিকেল ৫টার এই কর্মসূচিতে একমঞ্চে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিশিষ্ট অভিনেতা প্রকাশ রাজ, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা, প্রাক্তন আমলা তথা রাজ্যসভার সাংসদ জহর সরকার এবং প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিত্বদের। সব মিলিয়ে শারদোৎসবের ঠিক মুখে সিপিআই(এম) রাজ্য সদর দপ্তর চত্বর এখন বহুবিধ রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

