মুরতুজ আলম, সামসী: প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগেকার কথা। চাঁচল (Chanchal) শহরের অনতিদূরে পাহাড়পুর মরা মহানন্দা নদীর তীরবর্তী এলাকার সাহুরগাছি-বিদ্যানন্দপুর গ্রামে এক মহামারি দেখা দিয়েছিল। কথিত আছে, সেই সময়ের চাঁচলের রাজা স্বপ্নাদেশ পান, পাহাড়পুরের চণ্ডী মন্দিরের দেবীকে বিদায়বেলায় লন্ঠনের আলো দেখাতে হবে। তাহলে মহামারিমুক্ত হবে গ্রাম। তারপর থেকে বিজয়া দশমীর দিন এই রীতিতেই বিদায় জানানো হয় মাকে। শুধু হিন্দুরাই নন, লন্ঠন জ্বালিয়ে এই সমারোহে শামিল হন মুসলিমরাও।
রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরী এই পুজো শুরু করেছিলেন। যা চাঁচল রাজবাড়ির পুজো নামে খ্যাত। নদী থেকে পাওয়া অষ্টধাতুর চণ্ডীমূর্তি পাহাড়পুরে এনে প্রথমে কাঁচা মাটির ঘরে পুজো শুরু হয়। মাটির প্রতিমা গড়ে বার্ষিক দুর্গাপুজোও শুরু হয়। বর্তমানে রাজা নেই, রাজপাটও নেই। পরে রাজা শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরী পুজোর ভার নেন। তবে পুজোর জৌলুস হারাতে দেননি স্থানীয়রা। রাজপ্রথা মেনেই পুজোর সমস্ত আয়োজন করা হয়। আগে পুজোস্থলে একটি কুঁড়েঘর ছিল। পরবর্তীতে এখানে দুর্গাদালান তৈরি হয়। রাজ আমলে প্রবর্তিত লন্ঠন জ্বালানোর সেই রীতি আজও বংশানুক্রমে পালন করে আসছেন স্থানীয়রা। বিজয়া দশমীর দিন ঠিক গোধূলিবেলায় পাহাড়পুরের চণ্ডী মন্দিরের কিছুটা দূরে মরা মহানন্দা নদীতীরে গ্রামের প্রচুর লোক হাজির হয়ে যান লন্ঠন নিয়ে। বিদায় পর্বে মায়ের মুখ যেন উদ্ভাসিত হয় শতশত লন্ঠনের ক্ষীণ আলোয়।
চাঁচল রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পুজো টানা ১৮ দিন ধরে চলে। ষষ্ঠীর ১৪ দিন আগে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে শুরু হয় দেবী চণ্ডীর আরাধনা। কৃষ্ণ নবমীর সকালে সতীঘাটায় তামার ঘট ভরে ঢাকের বাদ্যি ও মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে পুজোর সূচনা হয়। অষ্টমীতে কুমারীপুজোর পাশাপাশি স্থানীয় পুজো কমিটি ও গ্রামবাসীদের উদ্যোগে ভাণ্ডারার আয়োজন থাকে। কয়েক হাজার ভক্ত সেই ভাণ্ডারায় অংশ নিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করেন। দশমীর সকালে পাহাড়পুর থেকে দেবীকে আনা হয় রাজবাড়িতে।
চাঁচল রাজ ট্রাস্টি বোর্ডের সুপারভাইজার দেবজয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘রাজার পুজো হওয়ায় এখানে অগণিত ভক্তসমাগম হয়।’ রাজ পুরোহিত সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, ‘রাজার স্বপ্নাদেশের পরেই এখানে কৃষ্ণ নবমী থেকে পুজো শুরু হয়। আজও এই প্রথা মেনে চলা হচ্ছে।’
চাঁচল সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক পার্থ চক্রবর্তী জানালেন, এবার দশমীতে হাজার দশেক দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। পুজোর জন্মলগ্ন থেকেই এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিসর্জনের দিন মাকে লন্ঠনের আলোয় বিদায় দেন। এবারও তাই হয়েছে।
