জয় মণ্ডল, নিউ জার্সি: নিউ জার্সির হাডসন নদীর তীরে আজ অন্য এক ঢেউ। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের চারপাশ, ম্যানহাটনের কফি শপ থেকে শুরু করে ট্রানজিট হাবগুলো- সবকিছুই এখন নিরেট হলুদ রঙে মোড়া। আটলান্টিক পেরিয়ে হাজার হাজার সমর্থক ভিড় জমিয়েছেন, আমেরিকার বুকে যেন একখণ্ড সাও পাওলো উঠে এসেছে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই মহারণে রবিবার যখন ব্রাজিল মাঠে নামবে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে এই বাঁধভাঙা সমর্থন (Brazil vs Norway)। আর সেই সমর্থনের আবহে মাঠের প্রান্তর পর্যন্ত একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকবে সেলেকাওদের আবেগ।
রবিবারের এই মরণবাঁচন ম্যাচের ঠিক আগে ধাক্কা খেয়েছে সেলেকাওরা। মাঝমাঠের অন্যতম প্রধান ভরসা লুকাস পাকুয়েতা হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে দল থেকে ছিটকে গিয়েছেন। নকআউটের প্রথম ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে অন্তিম মুহূর্তের গোলে জয় পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা ব্রাজিল খুব ভালো করেই জানে, কাজটা কতটা কঠিন। বিশেষ করে যখন উলটোদিকে রয়েছে আইভরি কোস্ট আর সেনেগালকে হারিয়ে আসা টুর্নামেন্টের অন্যতম ডার্ক হর্স নরওয়ে। কার্লো আনসেলোত্তি জাপানের বিরুদ্ধে বেঞ্চের গভীরতা পরখ করলেও, এবার পাকুয়েতার চোটের কারণে বাধ্য হয়েই মাঝমাঠের রণকৌশলে সামান্য বদল আনতে হচ্ছে। তবে অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ এখনই আতঙ্কিত হতে নারাজ, তাঁর ভরসা সেই চেনা আক্রমণাত্মক ফুটবলই।
আজকের লড়াইটা শুধু দুটো দলের নয়, দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ফুটবল দর্শনের। একদিকে ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের ক্ষিপ্রতা আর স্কিল, অন্যদিকে আর্লিং ব্রাউট হাল্যান্ডের ভয়ংকর শারীরিক ক্ষমতা আর নিখুঁত ফিনিশিং। ভিনিসিয়াস জুনিয়ার বল পায়ে পেলে ডিফেন্ডারদের মনে যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়, তা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দৃশ্য। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে যে খুনে ফর্মে তিনি খেলেন, সেই একই ছন্দ জাতীয় দলেও টেনে এনেছেন। বাঁদিক থেকে ভেতরে ঢুকে তাঁর চকিতে নেওয়া শট বা নিখুঁত ক্রসগুলোই আজ নরওয়ের রক্ষণভাগ ফালাফালা করার প্রধান অস্ত্র। নরওয়ের রাইট ব্যাকের সঙ্গে তাঁর স্নায়ুযুদ্ধটাই হয়তো ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেবে।
ঠিক উলটোদিকে, হাল্যান্ডকে নব্বই মিনিট বোতলবন্দি করে রাখলেও কোনও লাভ নেই। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির জার্সিতে তিনি যে ত্রাস সৃষ্টি করেন, রবিবার ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের সেই একই আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। মার্কুইনহোসদের এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরানোর উপায় নেই। নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের স্রেফ একটা সেকেন্ড দরকার। সামান্য একটা ফাঁক, আর বিপক্ষের সমস্ত প্রতিরোধ নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
নিউ জার্সির আর্দ্রতা আর গরমে ফুটবলারদের বারবার জলপানের বিরতি নিতে হলেও, ব্রাজিলের অনুশীলনে সেই চেনা হাসিখুশি পরিবেশ অটুট ছিল। বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে ছোট ছোট পাসে খেলা তৈরি করার দিকেই জোর দিচ্ছে ব্রাজিল। আনসেলোত্তি জানেন নরওয়ের মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ডের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর্সেনালের এই মিডফিল্ডারই নরওয়ের সমস্ত আক্রমণের নিউক্লিয়াস। ওডেগার্ডের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে হাল্যান্ডের দিকে যাওয়ার রাস্তাকে শুরুতেই ব্লক করার জন্য ক্যাসেমিরো বা ব্রুনো গুইমারেসদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। পাকুয়েতার অনুপস্থিতিতে মাঝমাঠ আগলানোর পাশাপাশি ফরোয়ার্ড লাইনে বল জোগানোর বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে হবে বাকিদের।
অন্যদিকে, নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেন তাঁদের অনুশীলনে জোর দিয়েছেন নিশ্ছিদ্র রক্ষণ আর লং বলের ওপর। তাঁদের ক্যাম্পের পরিবেশ ছিল একেবারে মিলিটারি ড্রিলের মতো-নিঃশব্দ, কঠোর এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, ব্রাজিলের আক্রমণ আছড়ে পড়তে দেওয়া এবং সুযোগ বুঝেই আচমকা আঘাত হানা। নরওয়ে জানে, বলের দখল হয়তো ব্রাজিলের পায়েই থাকবে বেশি। কিন্তু ফুটবল তো শুধু পজিশনের খেলা নয়, এটা সুযোগ কাজে লাগানোর চরম পরীক্ষা।
বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে শারীরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে কীভাবে আক্রমণ শানাতে হয়, তা সেলেকাওদের জানা। ইংল্যান্ড বা মেক্সিকোর বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়ার এই লড়াইয়ে পা পিছলে যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। যে দল স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারবে, তারাই শেষ আটের ছাড়পত্র পাবে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে রেফারির বাঁশি বাজলে বোঝা যাবে কার মুখে শেষ হাসি ফোটে। উত্তেজনার পারদ এখন চরমে, আর সেই পারদ ছুঁতে চলেছে নিউ জার্সির আকাশ।

