উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দলত্যাগ নাকি রাজনৈতিক দল পুনর্গঠন? রাজনীতির ময়দান পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবার আছড়ে পড়ল দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার অন্দরে। ২০ জন লোকসভা সাংসদের আকস্মিক বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন— ভারতীয় সংবিধানের ১০ম তফশিল বা ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ কি পারবে এই দলবদল রুখতে, নাকি আইনি মারপ্যাঁচে পার পেয়ে যাবেন বিদ্রোহীরা?
শুক্রবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) সঙ্গে দেখা করে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) যে ২০টি পৃথক আবেদন জমা দিয়েছেন, তা কেবল ২০ জন জনপ্রতিনিধির ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই নয়, বরং দেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক বড় ‘টেস্ট কেস’।
এতদিন লোকসভায় তৃণমূল একটি অবিভাজ্য শক্তি হিসেবে পরিচিত হলেও, ২০ জন সাংসদ এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের দাবি করছেন ‘ন্যাশনালিষ্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র অংশ হিসেবে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় যা চূড়ান্ত হাস্যকর। অভিষেক বলেন, “হঠাৎ করে এক অচেনা দলের নাম ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের আলাদা গোষ্ঠী দাবি করা হচ্ছে। এই দলটির নাম দেশের মানুষ তো দূর, ওই সাংসদেরাও আগে কোনোদিন শুনেছেন কি না সন্দেহ!”
তৃণমূলের পক্ষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবার যে আইনি লড়াইয়ের রূপরেখা তৈরি করেছেন, তার মূল ভিত্তি হলো সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঐতিহাসিক রায়। অভিষেক ব্যখ্যা দিয়েছেন, অন্য দলে যোগ দিলে স্বাভাবিক ভাবেই বিদ্রোহীরা তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদ খোয়াবেন। সেক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনে সাংসদদের সদস্যপদ খারিজ হবে। দলত্যাগ বিরোধী আইনে কোনও দলের ভেতরে কেবল ‘বিভাজন’ বা ‘উপদল’ তৈরি করে আইনি রক্ষাকবচ পাওয়া সম্ভব নয়। আবার কোনও দলের সাংসদেরা যদি অন্য দলে মিশে যেতে চান, তবে শুধু সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশ (2/third) সায় দিলেই চলবে না, মূল রাজনৈতিক দলটির দুই তৃতীয়াংশকে সেই সংযুক্তিতে (Merger) সিলমোহর দিতে হবে। কীতি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষের মতো তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদেরা আগেই সরাসরি স্পিকারের বাসভবনে চিঠি দিয়ে দলের এই বক্তব্য জানিয়ে এসেছেন, তৃণমূল লোকসভায় একটিই দল এবং দলের হুইপ ও অনুমোদিত নেতা ছাড়া অন্য কারোর কোনও আইনি অস্তিত্ব নেই।
এদিন বিদ্রোহী সাংসদ ও বিজেপিকে নিশানা করেরাজনৈতিক সংকটের পেছনে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (ED ও CBI) এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক। তাঁর দাবি, বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে ভয় ও প্রলোভনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা হয়েছে। বিদ্রোহীদের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের অবিলম্বে জনসমক্ষে এসে নতুন করে ভোটে লড়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। সংসদ সূত্রের খবর, আগামী জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হতে চলা বাদল অধিবেশনের আগেই স্পিকার ওম বিড়লা এই বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন। সম্প্রতি ডিএমকে (DMK) এবং আপ (AAP) সাংসদদের ক্ষেত্রে যে ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ দেখা গেছে, তৃণমূলের এই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের ভাগ্যও ঠিক একইভাবে নির্ধারিত হতে পারে। লোকসভার ওয়েবসাইটে তাঁদের বসার আসন বদল হয়, নাকি তাঁদের সাংসদ পদই খারিজ হয়ে যায়— এখন সেটাই দেখার।

