শুভঙ্কর চক্রবর্তী
রহস্যময় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বারে বারে দলকে বেকায়দায় ফেলেছেন তিনি। তাই দলীয় সাংসদ নগেন রায়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে বিজেপি। মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর সভায় ছিলেন না নগেন। বিজেপি সূত্রের খবর, রাজবংশী, কামতাপুরিদের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও নগেনকে জেনেবুঝেই গুরুত্বপূর্ণ সভায় ব্রাত্য রাখা হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী ভোট অঙ্কের বাধ্যবাধকতা থেকেই নগেনকে রাজ্যসভার সাংসদ বানিয়েছিল বিজেপি। তাই বেকায়দায় পড়লেও দাঁতে দাঁত চেপে এতদিন তাঁর যাবতীয় কার্যকলাপ সহ্য করেছে পদ্ম শিবির। বিধানসভা ভোটে দলের হয়ে প্রচারে না নামায় কোচবিহারের স্বঘোষিত মহারাজকে টাইট দিতে তখন থেকেই ছক কষেছিল বিজেপি নেতৃত্ব। আর সেই ছকেই নগেন বা তাঁর সংগঠন বাদে অন্য সমস্ত রাজবংশী, কামতাপুরি সংগঠনকে এক ছাতার তলায় আনার পরিকল্পনা শুরু করেছেন রাজ্যের সরকারি দলের নেতারা।
এতদিন প্রকাশ্যে বিজেপি নেতারা নগেনের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। এবার অবশ্য রাখঢাক না রেখেই দলীয় সাংসদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বলেছেন অনেক পদ্ম নেতাই। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তরবঙ্গে সংগঠন দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাপি গোস্বামীর কথা, ‘বিজেপিতে শৃঙ্খলা ও আদর্শই শেষ কথা। নগেনবাবু সেসব মানছেন না। উনি নানা সময় নানা বিতর্কিত কথা বলে দলকে অস্বস্তিতে ফেলছেন। নেতাজি সহ বিভিন্ন মনীষী সম্পর্কে কুমন্তব্য করছেন। এসব সহ্য করা হবে না। দলের ঊর্ধ্বে কেউ নন। দল ওনার শৃঙ্খলাহীন নানা কাজকর্মের মূল্যায়ন করেছে। সেইমতোই পদক্ষেপ হচ্ছে।’
সূত্রের খবর, শিক্ষা ও উন্নয়ন এবং যুক্তিকে সামনে রেখে মূলত বিজেপির ইন্ধনেই রাজবংশী সংগঠনগুলির যৌথমঞ্চ রাজবংশী মহাসংঘ তৈরি হয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারাও মহাসংঘের মাধ্যমে রাজবংশী, কামতাপুরি সংগঠনের মানুষদের চাহিদা বুঝে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে চাইছেন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককেই তাই মহাসংঘ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজ করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষোভের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া, নগেনের সংগঠনকে দুর্বল করা এবং রাজবংশী বুদ্ধিজীবীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে সার্বিকভাবে রাজবংশী সমাজে বিজেপি সম্পর্কে সদর্থক ভাবনা তৈরি করা- মহাসংঘকে অনুঘটক হিসাবে ব্যবহার করে এক ঢিলে এই তিন পাখি মারতে চাইছে বিজেপি।
তাঁর অনুগামীরা যেভাবে নগেনকে কখনও ‘মহারাজা’ কখনও ‘বিষ্ণুর অবতার’ হিসাবে প্রচার করছেন তাতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মানুষদের একাংশ ক্ষুব্ধ। সেই ক্ষোভ কাজে লাগাতে চাইছেন বিজেপি নেতারা। ব্যক্তি প্রচার নয়, সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়নই যে মুখ্য, বিভিন্ন সভায় সেকথাই বলছেন মহাসংঘের নেতারা। কয়েকদিন আগে কোচবিহারে সভা করে সেই বার্তাই দিয়েছেন তাঁরা। গতি ভালো নয় বুঝে বুধবার কোচবিহারের বড়গিলায় নিজের বাড়িতে অনুগামীদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন নগেন। সেই বৈঠকের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলতে চাননি সাংসদ৷ একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন তোলেননি। তাঁর সংগঠনের এক নেতার কথায়, ‘যেভাবে মহারাজের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয়েছে তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সেইসব নিয়েই আলোচনা হয়েছে৷ মহারাজ কিছু পরামর্শ, নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো বাইরে বলা নিষেধ আছে।’ সূত্রের খবর, এদিন কয়েক ঘণ্টা বৈঠক চলে। কারা কীভাবে তাঁর বা তাঁদের সংগঠনে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছেন তা নিয়ে সাংসদ আলোচনা করেন। তাঁর সঙ্গে যে বহু মানুষ আছেন সেটা প্রমাণের জন্য বড় সভা করার প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে এদিন আলোচনা হয়েছে।
নামে দলের সাংসদ হলেও নগেন যে এখন তাঁদের সমর্থন পাবেন না তা মোটামুটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। বঙ্গরত্ন কেড়ে নিয়ে অনেক আগেই কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে, বংশীবদন বর্মনরা এখন সরকার-ঘনিষ্ঠ। নাটাবাড়িতে তাঁদের সংগঠনের নেতা সরকারি দলের প্রতীকে বিধায়ক হয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা জীবন সিংহ বা তাঁর সংগঠন কেএসডিসি-ও বিজেপির সঙ্গে সখ্য রেখেই চলার পক্ষপাতী। কামতাপুরি ও রাজবংশী অন্য বেশিরভাগ সংগঠনই সরকারের বিরোধিতার রাস্তায় হাঁটতে নারাজ। সবমিলিয়ে কার্যত একঘরে হওয়ার দশা নগেনের। এই মুহূর্তে বেশ বেকায়দায় পড়েছেন তিনি। রাজ্য বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘দলের সাংসদ হয়েও বিধানসভার আগে তৃণমূলের অনেক কাছে চলে গিয়েছেন নগেন রায়। বঙ্গরত্ন নিয়েছেন এবং দলের হয়ে প্রচারে নামেননি। দু’নৌকায় পা দিয়ে চলার খেসারত এবার ওনাকে দিতে হবে।’

