Barnish | অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝেও মাটির প্রদীপে জীবিকার আলো, বার্নিশে আঁকড়ে থাকা ঐতিহ্য

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: পুজো এসে গেছে। তিস্তার হাওয়ায় লেগেছে শরতের গন্ধ। নদীর গা ঘেঁষা এই ছোট্ট জনপদে এখন কারও দম ফেলার অবকাশ নেই। গ্রামের পাশ দিয়েই চিরচেনা ছন্দে বয়ে চলেছে তিস্তা। প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল সেই দিনগুলো— যখন গ্রামের তরুণেরা নৌকা ভাসাতেন নদীর বুকে, গভীর তলদেশ থেকে তুলে আনতেন এঁটেল মাটি। সেই কাদামাটিই শিল্পীর হাতের নরম ছোঁয়ায় রূপ পেত পুজোর পবিত্র উপচারে।

তবে সময়ের স্রোতে আজ ছবিটা অনেকটা বদলে গিয়েছে। মাটির জায়গা দ্রুত দখল করে নিয়েছে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম আর ফাইবারের চকচকে বাসনপত্র। চিরাচরিত মাটির প্রদীপের (Clay lamps) স্নিগ্ধ আলো ম্লান করে দিচ্ছে ঝাঁ চকচকে চিনা টুনি বালব। হাটবাজার থেকে তাই বড় নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির সেই সোঁদা গন্ধ। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় নতুন প্রজন্মও আর এই পেশায় ভরসা পাচ্ছে না। বাপ-ঠাকুরদার মাটির চাকা ছেড়ে তারা বাধ্য হয়ে পা বাড়াচ্ছে ভিনরাজ্যে, নাম লেখাচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকের ভিড়ে। ঐতিহ্যবাহী বার্নিশের মৃৎশিল্পের আকাশে তাই এখন কালো মেঘের ঘনঘটা।

এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও কিন্তু ময়নাগুড়ির বার্নিশ (Barnish) পালপাড়ার চল্লিশটি পরিবার এখনও হাল ছাড়েনি। অন্য কোনও কাজ যে তাঁদের জানা নেই। বংশপরম্পরায় মাটির ছাঁচ গড়তেই হাত পেকেছে তাঁদের। নাড়ির সেই গভীর টানেই আজও তাঁরা পরম মমতায় আঁকড়ে রেখেছেন এই লোকশিল্পকে। প্রদীপ থেকে সরা, ধুনুচি থেকে ঘটি কিংবা কলসি থেকে মালশা— প্রতিটি উপকরণের  পরতে পরতে লেগে রয়েছে দিন-রাত এক করা রক্ত জল করা শ্রম। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে প্রবীণ শিল্পী অজিত পাল বলেন, ‘পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শেখা এই শিল্পই আমাদের মা-বাপ। অন্য কোনও কাজ তো শিখিনি। পুজো এলে এই কাজের ব্যস্ততায় কষ্টটা একটু ভুলে থাকতে পারি।’

ভোরের আলো ফুটতেই বার্নিশ পালপাড়ায় চাকা ঘুরতে শুরু করে, থামার সময় নেই কারও। উঠোনজুড়ে সারি সারি মাটির প্রদীপ, ধুনুচি, ঘট ও সরা রোদে শুকোতে দেওয়া হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি ঘরের যাবতীয় কাজ সেরে কোমর বেঁধে কাজে হাত লাগাচ্ছেন বাড়ির মহিলারাও। এমনকি পরিবারের ছোট্ট শিশুটিও তার কচি হাতে সদ্য গড়া মাটির থালা সযত্নে এগিয়ে দিচ্ছে রোদের দিকে।

আর এক মৃৎশিল্পী অর্চনা পালের কথায়, ‘ঘরের সব সামলে রোদে জিনিস শুকোনো, মাটি তৈরি— সবই তো একা হাতে করতে হয়। শরীর আর সইতে চায় না। তবু ভাবি, পুজোয় আমাদের গড়া দুটো মাটির প্রদীপ যখন মণ্ডপে আর মানুষের ঘরে ঘরে আলো দেবে, তখন মনটা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।’

বার্নিশ গ্রামে তৈরি এই মাটির সামগ্রী পৌঁছে যায় গোটা ডুয়ার্সের আনাচে-কানাচে। মৃৎশিল্পী অমর পালের বক্তব্য, ‘ডুয়ার্সের নানা বাজারে আমাদের জিনিস যায়। আয় হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু মাটির সঙ্গে এই জন্মজন্মান্তরের বাঁধনটা তো আর সহজে ছেঁড়া যায় না।’

আধুনিকতার আর অভাবের মাঝেও তিস্তাপাড়ের এই শিল্পীরা বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন বাংলার লোকশিল্পের ধারা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *