ঢাকা : স্বাধীনতার নতুন ভোরের স্বপ্ন কি তবে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে চলেছে? গত রাতে বাংলাদেশে (Bangladesh) যা ঘটল, তাকে নিছক ‘আবেগের বহিঃপ্রকাশ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এক ঐতিহাসিক ভুল। যখন রাষ্ট্রের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে একদল দুষ্কৃতী সংবাদপত্রের অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে তণ্ডব চালায়, তখন সরকারের এই ‘মৌনতা’ বা ‘নিষ্ক্রিয়তা’ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এক ভয়ংকর দেউলিয়া মানসিকতার পরিচয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে না পারা যে কোনো সরকারের জন্য সবথেকে বড় ব্যর্থতা।
গত রাতের এই আগ্নেয় পরিস্থিতির মূলে রয়েছে গত ১২ই ডিসেম্বর ছাত্রনেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হওয়া প্রাণঘাতী হামলা। ঢাকায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের গুলিতে গুরুতর জখম হয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে জীবনের লড়াই লড়ছিলেন তিনি। গতকাল রাতে তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত হতেই বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন উঠছে, এক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা থাকলেও কেন প্রশাসন আগাম সতর্কতা অবলম্বন করেনি? কেন গোয়েন্দা বিভাগ এই গণরোষের আঁচ পেতে ব্যর্থ হলো?
হাদির মৃত্যুকে ঢাল করে একদল উন্মত্ত জনতা ঢাকার কারওয়ান বাজারে দেশের অন্যতম প্রধান দুই সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’-এর কার্যালয়ে চড়াও হয়। সেখানে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাংবাদিকরা ভেতরে আটকা পড়ে থাকলেও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো কম। শুধু ঢাকা নয়, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনের সামনেও নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। এই তণ্ডব প্রমাণ করে দিল যে, বর্তমানে সে দেশে আইনের শাসনের চেয়ে ‘মব-জাস্টিস’ বা ভিড়ের শাসনই বেশি প্রভাবশালী।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের (Muhammad Yunus) অন্তর্বর্তী সরকার যখন ‘শান্তি’ ও ‘ন্যায়বিচারের’ বুলি আওড়াচ্ছে, ঠিক তখনই রাজপথে সাধারণ মানুষ ও সংবাদকর্মীদের জীবনের অধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে। প্রশাসন কেবল বিবৃতি দিয়ে দায় সারছে, কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে তণ্ডব থামানোর কোনো সদিচ্ছা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা কি তবে পরোক্ষভাবে দুষ্কৃতীদের উৎসাহিত করছে? যখন সংবাদপত্র—যা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ—আক্রান্ত হয়, তখন বুঝতে হবে সেই দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
একটি দেশ তখনই ভেঙে পড়ে, যখন তার সরকার নিজের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতার মসনদে বসে কেবল ভাষণ দিলেই হয় না, দুষ্কৃতীদের লোহার হাতে দমন করার সাহস দেখাতে হয়। যদি অতি দ্রুত এই নৈরাজ্য বন্ধ না হয় এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর এই আঘাতের বিচার না মেলে, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। সরকারের এই ‘মৌনতা’ ভাঙবে কবে? আর কত রক্ত ঝরলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে?
