দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: ল্যাজেগোবরে দশা আলিপুরদুয়ার পুরসভার (Alipurduar Municipality)। পুরসভার বিরুদ্ধে অডিট রিপোর্টে (Audit Report) একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এখন টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও বড়সড়ো গণ্ডগোল সামনে এসেছে। যা নিয়ে বিরোধীরা কটাক্ষ করতে ছাড়েনি।
পুরসভার তালিকাভুক্ত ঠিকাদাররা গত মে মাসেই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, নথিপত্রে কারচুপি এবং চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ করের দুর্ব্যবহার— এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তাঁরা সরব হন। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযোগের সঠিক জবাব না পাওয়া পর্যন্ত তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য পুরসভার সমস্ত টেন্ডার প্রক্রিয়া বয়কট করবে। ফলে উন্নয়নমূলক কাজ কার্যত থমকে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও সেই সময় চেয়ারম্যান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং নিয়মমাফিক।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজ্য সরকারের অডিট টিমের রিপোর্টে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক টেন্ডারে প্রতিযোগিতার মৌলিক নিয়ম মানা হয়নি। সরকারি বিধি অনুযায়ী, একটি টেন্ডারে অন্তত তিনটি আলাদা মালিকানাধীন সংস্থার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম খরচে ও উন্নতমানের পরিষেবা নিশ্চিত করা যায়। এই নীতিকেই প্রশাসনিক পরিভাষায় ‘হেলদি কম্পিটিশন’ বলা হয়।
প্রতিযোগিতার ছদ্মাবরণে একপাক্ষিক কাজ বণ্টনের অভিযোগ অডিট পর্যবেক্ষণে সামনে এসেছে। এই প্রক্রিয়া সরাসরি ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিন্যান্সিয়াল রুল লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি পরিকল্পিতভাবে নিয়ম ভাঙার ঘটনা? এই প্রেক্ষাপটে আলিপুরদুয়ার কনট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিতাংশু চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে হোক। সব ঠিকাদার যেন সমান সুযোগ পান, সেটাই আমাদের দাবি।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ঠিকাদার মহলের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিল।
রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মৃন্ময় সরকার অভিযোগ করেন, ‘অডিট রিপোর্টে যা সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা না থাকলে উন্নয়নের দাবি অর্থহীন।’ তাঁর মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বজনপোষণ বা পক্ষপাতিত্ব থাকলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী। সিপিএমের জেলা সম্পাদক কিশোর দাসের কথায় আরও কড়া সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি তৃণমূলের ভূষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে বহুবার টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, এবার অডিট টিমের রিপোর্টে তা প্রমাণিত হয়েছে। কাটমানির রাজনীতি আবারও সামনে এল। এই বিষয়ে আমরা রাস্তায় নামতেও প্রস্তুত।’ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলে বাম শিবির বড়সড়ো আন্দোলনে নামবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিজেপির জেলা সভাপতি মিঠু দাস বলেন, ‘এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ধারাবাহিকতা। অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ছিল না বলে অডিট রিপোর্ট প্রমাণ করেছে। মানুষ সব দেখছে, উপযুক্ত সময়ে জবাব দেবে।’ আলিপুরদুয়ার পুরসভার চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ করের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তঁার কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
সব মিলিয়ে, আলিপুরদুয়ার পুরসভার টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রশাসনিক সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। অডিট রিপোর্টে উত্থাপিত প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে। উন্নয়নের নামে যদি নিয়ম ভাঙা হয়ে থাকে, তবে তার জবাবদিহি অবশ্যম্ভাবী। প্রশাসন স্বচ্ছ তদন্তের পথে হাঁটবে, নাকি বিতর্ক আরও গভীর হবে– সবার নজর এখন সেদিকেই।
