অতীতের আলিপুরদুয়ার শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল ডাকবাংলো মাঠ। বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সভা থেকে শুরু করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই হত এই মাঠে। শ্রাবণ মাসে এই মাঠেই বসত বিশাল ঝুলনমেলা। আজ সেই মাঠের জায়গায় শুধুই কংক্রিটের জঙ্গল।
দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) শহরের পুরোনো দিনের কথা মনে করতে বসলে আজও প্রবীণদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ডাকবাংলো মাঠ। বর্তমান আলিপুরদুয়ার পুরসভার ১৫ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই থেকে আড়াই বিঘা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিল মাঠটি। একসময় এটি শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল। সন্ধে হলেই এই মাঠ থেকে ভেসে আসত বাজারের হাঁকডাক, শ্রাবণ মাস পড়লেই জমে উঠত ঝুলনমেলা। তবে আজ সেসবই স্মৃতির খাতায়। এখন সেখানে গজিয়ে উঠেছে সুপার মার্কেট, দোকানপাট ও কংক্রিটের জঙ্গল।
শুধু মেলা নয়, ডাকবাংলো মাঠের চারপাশে ছিল বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সরকারি বাংলো। কাঠের দোতলা ছোট ছোট ঘর, পুরোনো দিনের অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি- সব মিলিয়ে গোটা এলাকাটি ছিল প্রশাসনিক পরিকাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বর্তমানে এখানে পুলিশ ফাঁড়ির অস্তিত্ব না থাকলেও পুলিশ ফাঁড়ি নামে এলাকার পরিচয় রয়ে গিয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সভা থেকে শুরু করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই হত এই মাঠে।
শহরের প্রবীণ বাসিন্দা ল্যারি বসু এই মাঠের কথা মনে করতে করতে বলেন, ‘ডাকবাংলো মাঠ মানেই ছিল মানুষের ভিড়, আলো, উচ্ছ্বাস। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের চারপাশে তৈরি হত এক অন্যরকম পরিবেশ।’
শহরবাসীর প্রতিদিনের জীবনেও এই মাঠের ভূমিকা ছিল। ডাকবাংলো মাঠে প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাজার বসত। ৫০ থেকে ৬০ জন বিক্রেতা সন্ধ্যায় এখানে পসরা সাজিয়ে বসতেন। সবজি, মাছ, ফল সহ নানা জিনিস মিলত এই বাজারে। অনেকের রোজগারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই মাঠ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চেহারা বদলাতে শুরু করে। ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে সুপার মার্কেট তৈরির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই ডাকবাংলো মাঠের পরিসর সংকুচিত হতে শুরু করে। ঝুলনমেলার আয়োজনও ছোট হতে থাকে। সান্ধ্যকালীন বাজারও ধীরে ধীরে অন্যত্র সরে যায়। আজ যে বাজারটি বগুড়িবাড়ি সান্ধ্যকালীন বাজার বা ঝুলন চৌপথি এলাকার বাজার নামে পরিচিত, তার সূত্রপাত হয়েছিল এই বদলের মধ্যে দিয়ে।
আলিপুরদুয়ার চেম্বার অফ কমার্স তথা ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক প্রসেনজিৎ দে’র মতে, ‘ডাকবাংলো মাঠ একসময় শহরের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ঝুলনমেলা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বাইরের ব্যবসায়ীদের জন্যও আয়ের সুযোগ তৈরি করেছিল। সেই দিক থেকে এই মাঠ কেবল স্মৃতি নয়, শহরের পুরোনো অর্থনৈতিক গতিশীলতার সাক্ষী।’
কবি উত্তম চৌধুরীর কথায়, ‘ডাকবাংলো মাঠ শুধু উত্সবের জায়গা ছিল না। এটি ছিল শহরের মানুষের মিলনক্ষেত্র। এই মাঠের সঙ্গে আজও অনেকের ছোটবেলার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম এই মাঠের অস্তিত্ব চোখে দেখতে না পেলেও, পুরোনো মানুষের কাছে এটি আজও এক আবেগ।’
