Alipurduar | মাদারিহাটে সিন্ডিকেটের কবলে বালি-পাথর! কার পকেটে যাচ্ছে মুনাফা?

Alipurduar | মাদারিহাটে সিন্ডিকেটের কবলে বালি-পাথর! কার পকেটে যাচ্ছে মুনাফা?

শিক্ষা
Spread the love


মাদারিহাট: সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে মাদারিহাট (Madarihat) ব্লকের নদীগুলি যেন একশ্রেণির অসাধু কারবারিদের লুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি টাকা দিয়ে লিজ হোল্ডারদের কাছ থেকে বালি ও পাথর কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গত কয়েক বছর ধরে মাদারিহাট ব্লকজুড়ে এই চরম অরাজকতা ও সিন্ডিকেটরাজ চললেও, তা দেখার যেন কেউ নেই। কোনও সরকারি নজরদারি নেই। অভিযোগ উঠেছে, এই বেপরোয়া লুটের পিছনে ছিল কাটমানির চক্র। লিজ হোল্ডারদের উপার্জিত আয়ের একটা বড় অংশ কলকাতার এক সুনির্দিষ্ট প্রভাবশালী মহলে পৌঁছাত এবং একইসঙ্গে বিগত সরকারের স্থানীয় স্তরের একশ্রেণির নেতাদের পকেটেও নিয়মিত কাটমানি হিসেবে চলে যেত। এই প্রকাশ্য লুটপাট নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলির চরম উদাসীনতা ও দায় ঠেলার মানসিকতা স্পষ্ট। মাদারিহাট ব্লক ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক নবীন ইয়োনজন এই ব্যাপারে বলেন, ‘গাড়িতে রয়্যালটি আছে কি না, আমরা শুধু সেটাই পরীক্ষা করি। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়, সেটা জেলা মাইনিং ও মিনারেল দপ্তরের কাজ।’ এ দিকে কার্যত গা বাঁচাতে চাইলেন আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলা মাইনিং ও মিনারেল দপ্তরের ওসি সম্রাট রায়। তিনি কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করে শুধু বলেন, ‘সরকারি মূল্য কত, তা সরকারি ওয়েবসাইট দেখলেই জানা যাবে।’

নিয়ম অনুযায়ী, ২০০ ঘনফুট বালি কেনার জন্য সরকারি মূল্য ধার্য রয়েছে মাত্র ৯০০ টাকা। অথচ সেখানে লিজ হোল্ডাররা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে রয়্যালটি হিসেবে নিচ্ছেন ৩ হাজার টাকা। ফলে, একজন সাধারণ মানুষকে নিজের বাড়ি তৈরি বা অন্য কোনও নির্মাণকাজের জন্য বালি ও পাথর কিনতে গিয়ে গাড়িভাড়া সহ গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। নদী থেকে গন্তব্যের দূরত্ব সামান্য বাড়লে এই খরচের অঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ এই খোলাখুলি লুট রুখতে প্রশাসনের কোনও হেলদোল নেই। যদিও এই মাত্রাতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টিকে বিগত সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির ফসল বলেই দায় ঠেলেছেন আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা এবং মাদারিহাটের বিধায়ক লক্ষ্মণ লিম্বু। মনোজ বলেন, ‘চোরাপথে বালি, পাথর পাচার বন্ধ করতে মাদারিহাট ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিককে কড়া পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনে বালি, পাথরের রয়্যালটি বিক্রি করতে হবে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলে আমাদের সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

নদী লিজ নেওয়া ব্যবসায়ীদের আবার নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। মাদারিহাট ব্লকের ডিমডিমা, পাগলি ও গারুচিরা নদীর লিজ হোল্ডার মাফুজা বানুর স্বামী সোহেল রহমান বলেন, ‘আমরা কোটি টাকার ওপর আকাশছোঁয়া ডাক দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য নদীর বালি ও পাথর তোলার লিজ পেয়েছি। অথচ রাতের অন্ধকারে রয়্যালটি ফাঁকি দিয়ে প্রচুর গাড়ি বালি, পাথর নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। এই চুরির কারণেই আমাদের বেশি দাম নিতে হচ্ছে। প্রশাসন যদি এই চুরি বন্ধ করতে পারে, তবে দাম অনেকটাই কমে যাবে।’ একই সুর শোনা গেল ব্লকের আরেক লিজ হোল্ডারের গলাতেও। তিনি সাফ জানান, অনলাইন অকশনে নদীর লিজ পেতে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এত টাকা বিনিয়োগের পর যদি চোরাপথে গাড়ি চলে যায়, সেই কারণে বাধ্য হয়েই বেশি টাকায় রয়্যালটি বিক্রি করতে হয়। প্রশাসন কড়া হলে কম টাকায় রয়্যালটি দেওয়া সম্ভব।

স্বভাবতই এই চরম অরাজকতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পরিবহণ ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। মাদারিহাটের গাড়ি মালিক কৃষ্ণা শর্মা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘পাগলি ভুটান সীমান্ত থেকে মাদারিহাটে ২০০ সিএফটি বালি আনতে সাধারণ মানুষের খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়্যালটি বাবদ ৩ হাজার, শ্রমিকদের মজুরি ২ হাজার এবং গাড়ির তেল ও ভাড়া বাবদ বাকি টাকা চলে যায়। সরকার যেখানে অনেক কম টাকায় রয়্যালটি বিক্রি করছে, সেখানে লিজ হোল্ডারদের এই জুলুম আমরা মানব না। আমরা দ্রুত এই বিষয়ে সাংসদের দ্বারস্থ হচ্ছি।’ আরেক গাড়ি মালিক অলক দাসের কথায়, ‘আমরা চাই লিজ হোল্ডারদের এই একচেটিয়া দাদাগিরি বন্ধ হোক। সরকারি অফিস থেকে সরাসরি সরকারি মূল্যে রয়্যালটি বিক্রি করা হোক। তাহলে সাধারণ মানুষ সস্তায় বালি পাবেন।’

মাদারিহাটের নদীগুলির বালি ও পাথরের গুণগত মান অত্যন্ত উন্নত হওয়ায় একে স্থানীয় স্তরে ‘সোনার খনি’ বলা ভুল হবে না। প্রতিদিন ভিনরাজ্য ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ট্রাক এখানে ভিড় জমায়। আর এই বিপুল চাহিদাকে হাতিয়ার করেই চলছে কোটি কোটি টাকার রয়্যালটি কেলেঙ্কারি ও কাটমানির খেলা। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের আমলে এই নিয়মের কতটা রদবদল হবে, তা অবশ্য সময়ই বলবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *