ভাস্কর শর্মা, ফালাকাটা: পার্কিংয়ের (Parking Price Rip-off) নামে এবার লক্ষ লক্ষ টাকা তোলার অভিযোগ উঠল খোদ সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে। ফালাকাটা কিষান মান্ডিতে ওই টাকা তুলছে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলা রেগুলেটেড মার্কেট কমিটি। রোজ টাকা তোলা হলেও কিষান মান্ডিতে নেই স্থায়ী কোনও পার্কিং লট। এমনকি পার্কিংয়ের জন্য যে টাকা আদায় হচ্ছে তার জন্য সরকারি সই, স্বাক্ষর করা কোনও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি মাসে পার্কিং থেকে ১২ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা তোলা হচ্ছে। কিন্তু ওই টাকা কিষান মান্ডির বা কৃষকদের কোন উন্নয়নে লাগছে তা কিন্তু স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি কেউ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, একটি সরকারি দপ্তর কোনও টেন্ডার ছাড়াই কীভাবে পার্কিংয়ের নামে টাকা তুলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে আলিপুরদুয়ার জেলা রেগুলেটেড মার্কেট কমিটির সচিব উত্তম ভৌমিক বলেন, এই মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমের কাছে কিছু বলার নির্দেশ আমাদের নেই। যা বলার জেলা শাসক বলবেন। তবে এটা বলতে পারি পার্কিং থেকে যে টাকা তোলা হচ্ছে তা কিষান মান্ডির কাজে লাগানো হয়। বিষয়টি নিয়ে জানতে আলিপুরদুয়ারের জেলা শাসক ময়ূরী ভাসুকে বিষয়টি লিখে এবং পার্কিংয়ের রসিদও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়। তবে তঁার প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
কিষান মান্ডিতে কৃষকরা ফসল বিক্রি করতে আসেন। সেই ফসল কিনতে প্রচুর স্থানীয় এবং বাইরের পাইকারও আসেন। পাশাপাশি এখান থেকে ফসল কিনে ভিনরাজ্য এবং ভুটানেও নিয়ে যাওয়া হয়। ফসল নিয়ে যেতে রোজ ছোট-বড় প্রচুর গাড়ি ঢোকে কিষান মান্ডিতে। এই গাড়িগুলি থেকেই আদায় করা হয় পার্কিং ফি। আলিপুরদুয়ার জেলা রেগুলেটেড মার্কেট কমিটি এই পার্কিং ফি নিয়ে থাকে। কিষান মান্ডির গেটে ই-টিকিট দেওয়া হয় গাড়িচালকদের।
কিষান মান্ডিতে টোটো, গাড়ি ফসল নিয়ে বের হওয়ার সময় টাকা নেওয়া হয়। টোটো থেকে নেওয়া হয় ১০ টাকা, পিকআপ ভ্যান ৮০ টাকা এবং বড় গাড়ি ১৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। এছাড়া ১০ চাকার গাড়ি থেকে ২৫০ টাকা এবং ৩০ টনের গাড়ি ৩০০ টাকা করে পার্কিং ফি আদায় করা হয়। রোজ গড়ে ৩০০-৩৫০টি গাড়ি থেকে পার্কিং ফি ওঠে। এমনকি একটি গাড়ি দু’-তিনবার মাল পরিবহণের জন্য কিষান মান্ডিতে গেলে তার কাছে প্রতিবারই ফি নেওয়া হয়। রোজ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা তোলা হয় পার্কিংয়ের নাম করে। মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা আদায়। কিন্তু এত টাকা তোলা হলেও কিষান মান্ডিতে পার্কিংয়ের কোনও ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিনা টেন্ডারে একটি সরকারি দপ্তর কীভাবে নিজেই পার্কিংয়ের নামে টাকা তুলছে। রোজ যখন এত টাকা তোলা হচ্ছে তা কোন কাজে লাগানো হচ্ছে, তা এখন জানতে চাইছেন ব্যবসায়ী থেকে গাড়িচালকরা। তাঁদের অভিযোগ, পার্কিং ফি’র নামে টাকা তোলা হলেও তার কোনও হিসেব নেই আরএমসি’র কাছে।
কিষান মান্ডিতে আসা এক গাড়িচালক পুলক বর্মন বলেন, ‘যতবার গাড়িতে করে ফসল নিয়ে কিষান মান্ডি থেকে বের হই ততবার পার্কিং ফি দিতে হয়। আমাদের মতো ছোট গাড়িচালকদের রোজ অন্তত ৪৫০ টাকা পার্কিং দিতে হয়। কিন্তু আমরা সেখানে মাত্র ১ ঘণ্টার মতো গাড়ি রেখে ফসল লোড করাই। কিষান মান্ডিতে গাড়ি রাখার জন্য কোনও ব্যবস্থা নেই। পানীয় জল থেকে শুরু করে ভালো শৌচালয় নেই। অথচ আমরা টাকা দিচ্ছি।’
আরেক গাড়িচালক আখতার আলি বলেন, ‘আমরা পার্কিং ফি দিচ্ছি। তার বিনিময়ে আমাদের একটি স্লিপ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কোনও সরকারি সই বা সিল থাকছে না। আমাদের মনে হয় পার্কিং ফি’র নামেও কিছু একটা ঘোটালা হচ্ছে।
তৃণমূল আমলে ফালাকাটায় কিষান মান্ডি তৈরি হয়। পরে যা রাজ্যের অন্যতম মান্ডির শিরোপা পায় ফালাকাটা। দেশের বিভিন্ন রাজ্য সহ ভুটান থেকেও এখানে পাইকাররা সবজি কিনতে আসেন। সম্প্রতি এই কিষান মান্ডি নিয়েই এবার একাধিক অভিযোগ উঠছে। এর মধ্যে অন্যতম পার্কিং ফি-র নামে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা। অনেকের অভিযোগ, কিষান মান্ডি থেকে দীর্ঘদিন ধরেই পার্কিং ফি-র নামে যে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা হচ্ছে সেটা এক শ্রেণির কর্মী-আধিকারিকদের পকেটে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আলিপুরদুয়ার জেলা রেগুলেটেড মার্কেট কমিটির একাংশও জড়িত বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
ফালাকাটার বিধায়ক দীপক বর্মন বলেন, ‘ইতিমধ্যেই এমন ধরনের অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। আমি বিষয়টি আলিপুরদুয়ারের জেলা শাসককে সব লিখিত আকারে জানাচ্ছি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে।’
