দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: শেষযাত্রাতেও নিস্তার নেই চূড়ান্ত ভোগান্তি থেকে! বিদ্যুৎ চলে গেলেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে দাহকাজ। বুধবার সকাল থেকেই বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন থাকায় শহরের একমাত্র বৈদ্যুতিক চুল্লিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ রইল শেষকৃত্য। শোভাগঞ্জ শ্মশানে এসে চরম হেনস্তার মুখে পড়ে মৃতদেহ নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলেন স্বজনহারা পরিবারের সদস্যরা। পুরসভার চরম গাফিলতির জেরে শ্মশানের বিকল্প বিদ্যুৎ পরিকাঠামো অর্থাৎ জেনারেটরটি প্রায় তিন মাস ধরে পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। আর এদিন লোডশেডিং হতেই সেই প্রশাসনিক উদাসীনতার চরম মাশুল গুনতে হল সাধারণ মানুষকে।
শ্মশানের এক কর্মী বলেন, ‘জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। বিষয়টি একাধিকবার পুরসভাকে জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে যে মারাত্মক সমস্যা হবে, সেটাও বারবার বলা হয়েছিল। কিন্তু এতদিনেও মেরামতের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বুধবার বিদ্যুৎ বন্ধ হতেই তার ফল হাতেনাতে দেখা গেল।’
শোভাগঞ্জের এই শ্মশানই আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) শহর ও পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের ভরসাস্থল। কম খরচে এবং কম সময়ে দাহকাজের জন্য মানুষ এই চুল্লির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে এমন জরুরি পরিষেবায় বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা পুরসভার ভূমিকাকে বড়সড়ো প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শ্মশানের চুল্লি ঘিরে এই বিশৃঙ্খলা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ঝড়ে পুরসভার একটি চুল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বসে যায়। তার আগে থেকেই অন্য চুল্লিটি বিকল হয়ে পড়েছিল। ফলে টানা পাঁচ মাস বৈদ্যুতিক দাহকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। পরবর্তীকালে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর জোড়াতালি দিয়ে একটিমাত্র চুল্লি চালু করা হলেও দ্বিতীয় চুল্লিটি আজও মেরামত হয়নি। ফলে একটিমাত্র চুল্লির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তার ওপর তিন মাস ধরে জেনারেটরটি অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় গোটা পরিষেবাটাই এখন কার্যত ভাগ্যের ভরসায় চলছে।
বর্তমানে আলিপুরদুয়ার পুরসভা কার্যত অভিভাবকহীন। পুরসভায় নেই কোনও নির্বাচিত চেয়ারম্যান, নেই কোনও প্রশাসকও। পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসারও নিয়মিত অফিসে আসেন না বলে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ফলে নষ্ট চুল্লি বা জেনারেটর মেরামতের মতো জরুরি বিষয়ে প্রশাসনিক ছাড়পত্র দেবে কে, তা নিয়েই গভীর অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পুরসভা সূত্রে দায়সারাভাবে দাবি করা হয়েছে, জেনারেটরটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী দু’একদিনের মধ্যেই তা চালু করা হবে।
তবে পুরসভার এই ভূমিকায় ফুঁসছেন নাগরিকরা। শহরের বাসিন্দা আশুতোষ বিশ্বাস তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানে এসে যদি বিদ্যুৎ নেই বলে ফিরে যেতে হয়, তার থেকে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে? জেনারেটর তিন মাস ধরে খারাপ, অথচ সেটি সারানোর ন্যূনতম সদিচ্ছা পুরসভার নেই, এটা মেনে নেওয়া অসম্ভব।’ আর এক বাসিন্দা গৌতম সাহার কথায়, ‘শ্মশানের মতো অতি স্পর্শকাতর জায়গায় বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা সবসময় প্রস্তুত থাকা বাধ্যতামূলক। তিন মাস ধরে
জেনারেটর বন্ধ থাকার পরেও কারও কোনও হেলদোল নেই, তা হলে পুর কর্তৃপক্ষের নজরদারিটা কোথায়?’
পুরসভার তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দলনেতা তথা ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার শান্তনু দেবনাথ বলেন, ‘পুরসভায় চেয়ারম্যান নেই, প্রশাসক নেই, এগজিকিউটিভ অফিসারও নিয়মিত অফিসে আসছেন না। ফলে মানুষের সমস্যা শুনবে কে, তা-ই এখন বড় প্রশ্ন। শ্মশানের মতো জরুরি পরিষেবার জেনারেটর তিন মাস ধরে খারাপ, বারবার জানানোর পরেও তা ঠিক হয়নি। বিদ্যুৎ চলে গেলে মৃতদেহ নিয়ে মানুষকে ফিরে যেতে হচ্ছে। পুরসভার এই প্রশাসনিক অচলাবস্থার খেসারত কেন সাধারণ মানুষ দেবেন? জরুরি পরিষেবাগুলি সচল রাখার জন্য অবিলম্বে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

