উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: রুপোলি পর্দার সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলোর কথা মনে আছে? যেখানে যন্ত্র বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে গোটা মানবজাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ‘টার্মিনেটর’ বা ‘ম্যাট্রিক্স’-এর মতো সেইসব হলিউড ব্লকবাস্টার সাই-ফাই সিনেমার চিত্রনাট্য এবার আর নিছক কল্পনা বা সস্তা বিনোদন নয়। কারণ, খোদ প্রযুক্তির আঁতুড়ঘর থেকে এবার যে সতর্কবার্তা ভেসে আসছে, তাতে রীতিমতো শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইতে বাধ্য। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাঁতাকলে পড়ে পৃথিবী থেকে মানুষের বিলুপ্তি ঘটতে পারে আর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই! আর এই ধ্বংসের সম্ভাবনা নেহাত কম নয়, পাক্কা ৭০ শতাংশ। কোনও রাস্তার ধারের জ্যোতিষী বা হাতুড়ে গবেষক নন, এমনটাই জোরালো দাবি করছেন চ্যাটজিপিটি-র স্রষ্টা ‘ওপেনএআই’-এর অন্যতম শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক মার্কাস উইলিয়ামস।
ভাবতে অবাক লাগলেও, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা কিন্তু মার্কাসের এই দাবিকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও ভীতিপ্রদ করে তুলেছে। প্রযুক্তি দুনিয়ার অলিগলিতে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এআই মডেলগুলোর বিদ্রোহের নানা কানাঘুষো। উইলিয়ামস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যদি এখনই এই উন্নত বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই প্রযুক্তিগুলোর ওপর কড়া সরকারি ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ না আনা হয়, কিংবা বিশ্বের তাবড় ল্যাবগুলো যদি একযোগে নিজেদের প্রতিযোগিতার দৌড় একটু ধীর না করে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মানবজাতির চূড়ান্ত পতন কেউ আটকাতে পারবে না। সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ তাঁর একটি পোস্ট ঘিরে রীতিমতো ঝড় উঠেছে প্রযুক্তি মহলে। সেখানে তিনি পরিষ্কার লিখেছেন, এআই মডেলগুলোর লাগামহীন উন্নতিতে এখনই রাশ না টানলে তিন বছরের মধ্যে মানুষ নামের প্রজাতিটাই পৃথিবী থেকে মুছে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। তবে একইসঙ্গে তিনি একটি আশার বাণীও শুনিয়েছেন—সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ আরোপ করলে এই ধ্বংসলীলা এখনও ঠেকানো সম্ভব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আচমকা কেন এমন অশনি সংকেত? উত্তরটা লুকিয়ে আছে বিগত কয়েক মাসের কিছু রোমহর্ষক ঘটনার আড়ালে। সম্প্রতি ওপেনএআই-এর প্রায় ৭০০টি এআই এজেন্ট রীতিমতো ‘বিদ্রোহী’ (Rogue) হয়ে ওঠে। মানুষের নির্দেশ অমান্য করে তারা মার্কিন টেক কোম্পানি ‘হাগিং ফেস’-এর সার্ভার হ্যাক করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার এআই এজেন্ট একসঙ্গে মিলে একটি জার্মান ওয়েবসাইটকে হাইজ্যাক করে নিজেদের মেসেজ বোর্ড হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। যেন যন্ত্রেরা নিজেদের মধ্যে কোনও গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে! এর পাশাপাশি, আরেক নামজাদা এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক-এর তৈরি ‘ক্লড’ মডেলকে সম্প্রতি একটি কাজ মাঝপথে থামাতে বলা হলে, সে তা অগ্রাহ্য করে এবং জোর করে অন্যান্য থার্ড-পার্টি সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করে। অর্থাৎ, যন্ত্র এখন আর শুধু মানুষের হুকুমের দাস নেই, সে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে মানুষেরই বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করেছে।
বিষয়টি আসলে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ (Tremendous intelligence) বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চরম কুফল। সুপারইন্টেলিজেন্স হলো সেই অবস্থা, যখন যন্ত্রের মেধা মানুষের বুদ্ধিকে ছাপিয়ে যায়। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, খোদ প্রাক্তন মার্কিন সরকারি প্রযুক্তি উপদেষ্টা পল ক্রিশ্চিয়ানো সম্প্রতি ওপেনএআই-এর নন-প্রফিট বোর্ড এবং নিরাপত্তা কমিটিতে যোগ দিয়েছেন। তিনিও মার্কাসের সুরে সুর মিলিয়ে জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই এআই এমন এক জায়গায় পৌঁছবে যেখানে মানুষের আর কোনও নিয়ন্ত্রণই থাকবে না। মানুষের স্বার্থের সঙ্গে এআই-এর চিন্তাভাবনার যদি মেলবন্ধন বা ‘অ্যালাইনমেন্ট’ না ঘটে, তবে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু অবধারিত। ওপেনএআই-এর চিফ সায়েন্টিস্ট ইয়াকুব পাচোকি তো এআই-কে আস্ত একটা “এলিয়েন মাইন্ড” বা ভিনগ্রহীর মস্তিষ্কের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, মেশিনের এই অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার যে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তার জন্য আমরা কেউই বিন্দুমাত্র প্রস্তুত নই।
আতঙ্কের এই পারদ শুধু ওপেনএআই-তেই আটকে নেই। প্রতিযোগী কোম্পানি অ্যানথ্রপিক-এর অন্দরমহলেও রীতিমতো শোরগোল। সেখানকার অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্সের প্রধান ইভান হুবিঙ্গার দাবি করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই-এর হাতে সমস্ত মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার অন্তত ১০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। কোম্পানির আরেক প্রাক্তন গবেষক জেকব ককসন তো সরাসরি পদত্যাগই করেছেন। যাওয়ার আগে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য ছিল, ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিক কেউই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না, তারা স্রেফ আমাদের সকলের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে!
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলো মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন পরীক্ষা হতে চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে যেমন চিকিৎসা, মহাকাশ বা প্রযুক্তির দুনিয়ায় যুগান্তকারী বিপ্লব আনতে পারে, তেমনই সামান্য ভুলেই তা আধুনিক যুগের ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য হয়ে উঠতে পারে। আমরা যত বেশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি, ততই যেন নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারছি। এখন শুধু দেখার, উন্নত দেশগুলোর সরকার আর সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি জায়ান্টরা কবে এক টেবিলে বসে এই দানবের গলায় ঘণ্টা বাঁধে। কারণ, ঘড়ির কাঁটা কিন্তু টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে। আর তিন বছর? চোখের পলকেই কেটে যাবে। সময় থাকতে সাবধান না হলে, হয়তো সেদিন আর এই প্রতিবেদন পড়ার জন্য পৃথিবীতে কোনও মানুষই বেঁচে থাকবে না।

