Abhishek Banerjee | আর কতদিন অভিষেকের অপেক্ষায় থাকবেন যুবরাজ?

Abhishek Banerjee | আর কতদিন অভিষেকের অপেক্ষায় থাকবেন যুবরাজ?

ব্লগ/BLOG
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: কলকাতার সীমানা ছাড়িয়ে যদি আপনি ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে এগোতে থাকেন, জানুয়ারির এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালেও একটা জিনিস আপনার নজর এড়াবে না। রাস্তার দু’ধারে প্রতি ৫০ ফিট অন্তর সুবিশাল হোর্ডিং। সেখানে হাসিমুখে হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছেন স্থানীয় সাংসদ। কোনোটিতে লেখা ‘বাংলার ভবিষ্যৎ’, কোনোটিতে ‘সেনাপতি’, আবার কোনোটিতে সোজা সাপটা—‘যুবরাজ’। এই ছবিগুলো কেবল প্রচারের কৌশল নয়, এ এক প্রতাপের ‘স্টেটমেন্ট’।

২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে বাংলার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচ্য ‘দিদি বনাম মোদি’র লড়াই নয়, বরং কালীঘাটের টালির চালের ঘর থেকে ক্যামাক স্ট্রিটের ঝাঁ চকচকে অফিসের মধ্যে অদৃশ্য সুতোর টানাপোড়েন। প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা জটিল—‘পিসি বনাম ভাইপো’, নাকি ‘উত্তরাধিকারের মসৃণ হস্তান্তর’? তৃণমূলের (TMC) অন্দরে এখন এক অমোঘ পালাবদলের শব্দ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)—যিনি কিছুদিন আগে পর্যন্ত বিরোধীদের কাছে ‘ভাইপো’ বলে কটাক্ষের পাত্র ছিলেন, আজ তিনি এক স্বতন্ত্র ‘ব্র্যান্ড’। তাঁর উত্থান রকেটের গতিতে, কৌশল কর্পোরেট ধাঁচের, আর লক্ষ্য পাখির চোখের মতো স্থির। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—অভিষেক কি বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করছেন?

আবেগ বনাম অ্যালগরিদম

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিকে বুঝতে হলে গতানুগতিক চশমাটি খুলে ফেলতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির ইউএসপি হল অপরিসীম আবেগ এবং মাটি কামড়ে পড়ে থাকা। সেখানে অভিষেক এনেছেন ‘ডেটা’ এবং ‘ডিজিটাল ডিসিপ্লিন’। তাঁর হাতে থাকে আইপ্যাড, পিঠে থাকে একদল ঝকঝকে কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজিস্ট, যাঁরা রাজনীতির ময়দানকে দেখেন এক্সেল শিটের নিরিখে।

অভিষেকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল তাঁর খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। তিনি যখন দিল্লিতে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন, তখন তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ এবং যুক্তির ধার দেখে মনে হয় তিনি কোনো ঝানু কূটনীতিক। আবার যখন বাঁকুড়া বা কোচবিহারের জনসভায় মাইক ধরেন, তখন তাঁর গলায় শোনা যায় আশির দশকের মমতার সেই আগ্রাসী সুর। তিনি আজকের ‘জেন-জি’ ভোটারদের পালস বোঝেন। তিনি জানেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম কেবল স্লোগানে ভোলে না, তারা কাজ দেখতে চায়।

ডায়মন্ড হারবারকে তিনি সেই ‘মডেল ল্যাবরেটরি’ হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। ‘এক ডাকে অভিষেক’, ‘সেবাশ্রয়’-এর মতো উদ্যোগ থেকে শুরু করে নিজের লোকসভা কেন্দ্রে বার্ধক্য ভাতা নিশ্চিত করা—এগুলো কেবল জনসেবা নয়, এগুলি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার ‘শো-কেস’। বার্তাটা খুব স্পষ্ট এবং তীক্ষ্ণ:, আমি প্রশাসনের দায়িত্ব নিতেও তৈরি।

‘কর্পোরেট’ বনাম ‘কালীঘাট’

তবে সবটাই কি মসৃণ? মুদ্রার উল্টো পিঠটাও আছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ডিএনএ-তে রয়েছে আন্দোলন এবং বিশৃঙ্খলা, যা অনেক সময় সাংগঠনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা দেয়। অভিষেক চেয়েছেন এই বিশৃঙ্খলাকে ‘শৃঙ্খলায়’ বাঁধতে। আর এখানেই সংঘাত। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, সৌগত রায় বা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ নেতারা, যাঁরা গোড়া থেকে মমতার সাথে লড়াই করে দলটাকে এই জায়গায় এনেছেন, তাঁরা অভিষেকের এই ‘কর্পোরেট স্টাইল’ কতটা মন থেকে মেনে নিচ্ছেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রবীণদের একাংশের ঘরোয়া আড্ডায় কান পাতলে শোনা যায়, “রাজনীতিটা ল্যাপটপে হয় না, মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে হয়।” যদিও প্রকাশ্যে কেউই বিদ্রোহ করেননি, কিন্তু একটা নীরব যুদ্ধ দলের অন্দরে বহমান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও অভিষেককে পাশে বসিয়ে ‘আমার উত্তরসূরি’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আবার কখনও বলেছেন, “আমি এখনই ফুরিয়ে যাইনি, আমিই পাহারাদার।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩৬ সাল পর্যন্ত মমতার ক্ষমতায় থাকার যে জল্পনা ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা আসলে অভিষেকের ধৈর্য পরীক্ষার নামান্তর। কিন্তু অভিষেক-ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, যুবরাজ এখনই মুখ্যমন্ত্রী হতে চান না, কিন্তু তিনি চান দলের পূর্ণ এবং নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। তিনি চান, দলটা তাঁর তৈরি করা সিস্টেমে চলুক, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে সংগঠন বড় হবে।

অভিযোগ বিস্তর, কিন্তু ‘দাঁত ফোটাতে’ ব্যর্থ ইডি-সিবিআই

বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার অভিষেককে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে কোনো কসুরই রাখেনি। কয়লা বা গোরু পাচারের পুরনো অভিযোগ তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থার দফতরে ইডি-র ম্যারাথন তল্লাশি। ‘কালীঘাটের কাকু’ বা সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা বারবার পৌঁছতে চেয়েছেন অভিষেকের দুয়ারে। নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে হাজার হাজার পাতার চার্জশিট পেশ হয়েছে, নাম উঠে এসেছে সংস্থার ডিরেক্টরদের, কিন্তু ২০২৬-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে একটা কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার—কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো অভিযোগের ফানুস ওড়ালেও, অভিষেকের হাতে হাতকড়া পরানোর মতো কোনো ‘সলিড’ প্রমাণ তারা আদালতে পেশ করতে পারেনি। ইডি-সিবিআই কখনও তাঁকে, কখনও তাঁর স্ত্রীকে নিজাম প্যালেস বা সিজিও কমপ্লেক্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতি-সক্রিয়তা শেষমেশ অভিষেকের ‘ভিকটিম কার্ড’-কেই শক্তিশালী করেছে। তিনি বুক চিতিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, “ক্ষমতা থাকলে গ্রেফতার করুন, প্রমাণ দিন, নচেৎ ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করব।” এই আগ্রাসী মনোভাব, চোখের দিকে চোখ রেখে কথা বলার ভঙ্গি তাঁকে কর্মীদের চোখে আরও বড় হিরো বানিয়েছে। যে দুর্নীতির কালিতে তাঁর ভাবমূর্তি লিন করার চেষ্টা হয়েছিল, তা তাঁর ইমেজে সামান্য আঁচড়ও কাটতে পারেনি। উল্টে, তিনি নিজেকে দিল্লির এজেন্সির ‘স্বৈরাচার’-এর বিরুদ্ধে বাংলার একমাত্র ‘লড়াকু মুখ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছেন।

নারী ভোট ও তারুণ্যের প্রতীক

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং রাজ্যের বিশাল মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। অভিষেক খুব সচেতনভাবেই সেই ভোটব্যাঙ্ককে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছেন। তিনি জানেন, মমতার অবর্তমানে এই ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর সাম্প্রতিক জনসভাগুলোতে মহিলাদের, বিশেষ করে তরুণী ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তিনি কেবল ‘দিদির ভাইপো’ নন, তিনি এক ‘চার্মিং’ লিডার, যিনি স্মার্টলি কথা বলেন, কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখান এবং নারী সুরক্ষায় জিরো টলারেন্সের কথা বলেন। অন্যদিকে, তৃণমূল ছাত্র পরিষদ বা যুব তৃণমূলের কাছে তিনি প্রশ্নাতীত ‘আইকন’। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে এই যুব শক্তিই হতে চলেছে গেম চেঞ্জার। উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল—যুব সমাজ চাইছে নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা। অভিষেক সেই ভাষাটাই বলছেন।

সিংহাসনের দূরত্ব কতটুকু?

আজকের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৪ বা ২০১৯-এর অভিষেকের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। তিনি জানেন কখন থামতে হয়, আবার কখন আঘাত করতে হয়। ডায়মন্ড হারবারের (Diamond Harbour Mannequin) ওই হাজার হাজার পোস্টার কেবল প্রচার নয়, ওগুলো এক একটি মাইলস্টোন, যা মনে করিয়ে দিচ্ছে—যুবরাজ প্রস্তুত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো আরও ১০ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন, বা হয়তো থাকবেন না। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের স্টিয়ারিং যে ইতিমধ্যেই পরোক্ষভাবে অভিষেকের হাতে চলে গেছে, তা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। টিকিট বণ্টন থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণ—সর্বত্রই এখন ‘অভিষেক-ছাপ’ স্পষ্ট। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘গেম চেঞ্জার’ হতে চলেছে তাঁর নতুন কর্মসূচি—‘আবার জিতবে বাংলা’ যাত্রা। ২০২৩-এর ‘নবজোয়ার’ যাত্রা যেমন পঞ্চায়েত ভোটে দলকে অক্সিজেন যুগিয়েছিল, ঠিক তেমনই ২০২৬-এর আগে সংগঠনকে নিশ্ছিদ্র করতেই এই ব্লু-প্রিন্ট। আগামী এক মাস ধরে রাজ্যজুড়ে রোড-শো এবং জনসভা করবেন অভিষেক। এই যাত্রার মূল ফোকাস দুটি— মমতা সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরা এবং বাংলার সংস্কৃতি ও স্বভিমান রক্ষা।

বিরোধীদের আক্রমণের জবাবে অভিষেকের স্লোগানও তৈরি—“যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।” নারী ভোট এবং যুব সমাজকে টার্গেট করে অভিষেক বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, সিংহাসনের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর যখনই হোক, সেনাপতি এখন পুরোদস্তুর যুদ্ধের ময়দানে। এখন দেখার, তিনি কি ‘শ্রাবণ কুমারের’ মতো অপেক্ষা করবেন নাকি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সময়ের আগেই মুকুট দাবি করে বসবেন?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *