৬ ইঞ্চির স্ক্রিনে শুরু ভোটের ‘খেলা’

৬ ইঞ্চির স্ক্রিনে শুরু ভোটের ‘খেলা’

ব্লগ/BLOG
Spread the love


দীপ সাহা

প্রথমে ছিল স্রেফ ‘খেলা হবে’। সেখান থেকে বিবর্তিত হয়ে দাঁড়াল ‘ভয়ংকর খেলা হবে’। আর এখন বাংলা রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে সেটাই নতুন মোড়কে ‘ফাটাফাটি খেলা হবে’। শেষের এই আপ্তবাক্যটির বক্তা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee), যিনি রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) সর্বময় নেত্রীও।

বঙ্গ রাজনীতিতে একসময় যা ছিল নিছকই কর্মীদের চাঙ্গা করার স্লোগান, আজ সেটাই এক নির্মম বাস্তব।

আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলায় ভোট ঘোষণা কবে হবে ঠিক নেই, কিন্তু তার আগেই চুপিসারে ‘খেলা’ শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনীতিতে। এই খেলা অবশ্য এখন আর মাঠের ধুলোবালি মেখে নয়, হচ্ছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের নরম গদি আর স্মার্টফোনের নীল আলোর জগতে।

রাজনীতির অ্যালগরিদম নিয়ে যাঁরা নাড়াঘাঁটা করেন, তাঁরা এর নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল নিলাম’। হাটের নাম সোশ্যাল মিডিয়া, পণ্য হল ‘জনমত’, আর সেই পণ্যের দালাল, যাদের কেতাবি নাম ‘ইনফ্লুয়েন্সার’। একদা যাঁরা লিপস্টিকের শেড কিংবা বিরিয়ানির হাঁড়ির খবর দিয়ে নেটিজেনদের মন ভোলাতেন, আজ তাঁরাই রাজনীতির গুরুগম্ভীর বুলি আউড়ে ঠিক করে দিতে চাইছেন আপনি কাকে ভোট দেবেন।

এপার বাংলার রাজনীতিতে ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি তৃণমূল কুক্ষিগত করে রাখলেও, আড়ালে কিন্তু বেড়ে ‘খেলছে’ বিজেপিও। বাম, কংগ্রেসের কথা বাদ রাখছি, কারণ এই ‘খেলা’য় তারা দুধভাত। আছে আবার নেই-ও।

ক’দিন আগে উত্তরবঙ্গের এক ইনফ্লুয়েন্সার বলছিলেন, ‘ছয় অঙ্কের অফার পেয়েছিলাম দাদা। দুটো দলের থেকেই। কিন্তু নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারলাম না। আমার বন্ধু এবং ভাইস্থানীয় অনেকেই ফাঁদে পা দিয়েছে। অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার লোভ তো…।’

কথাটা যে ভুল নয়, তার প্রমাণ পেলাম গত পরশু। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে চোখ আটকাল এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রোফাইলে। হাসিঠাট্টার নানা ভিডিও বানান তিনি। দিনদুয়েক আগে হঠাৎ রাজনৈতিক একটি ভিডিও ছেড়েছেন। মারাত্মক ভাইরাল সেই ভিডিও। বিষয়- ভোট দেওয়ার আগে মনে আনুন শাসকের কু-কীর্তি। একেবারে সিনেমার কায়দায়। সরকারবিরোধী স্ক্রিপটও নিখুঁত। দু’দিনেই সেই ভিডিও দেখে ফেলেছেন প্রায় ৬২ লাখ দর্শক। ঝড়ের গতিতে রোজ বাড়ছে ভিউজ, লাইক, শেয়ারও।

তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি, বাংলার রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আজ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে নেমেছে এই কদর্য কেনাবেচার খেলায়। তাদের হাতে টাকার থলি, আর উলটোদিকে দাঁড়িয়ে আছেন এইরকম একদল ডিজিটাল ফেরিওয়ালা। যাঁরা উপযুক্ত দাম পেলেই নিজেদের বিবেক, বুদ্ধি এবং ফলোয়ারদের বিশ্বাস বিক্রি করতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করছেন না।

একটা সময় ছিল যখন নির্বাচনের আগে পাড়ার মোড়ে মোড়ে জটলা হত, চায়ের দোকানে ঝড় উঠত তর্কে-বিতর্কে। দেওয়াল লিখনে ফুটে উঠত কার্টুন, ছড়া আর রাজনৈতিক শ্লেষ। সেই সবকিছুর মধ্যে একটা প্রাণের স্পর্শ ছিল, একটা মতাদর্শগত লড়াইয়ের গন্ধ ছিল। কিন্তু আজ দেওয়াল লিখনের জায়গা নিয়েছে ফেসবুকের ওয়াল, আর পাড়ার মোড়ের বক্তার জায়গা নিয়েছেন ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামের তথাকথিত তারকারা।

সমস্যাটা অবশ্য মাধ্যম বদলানো নিয়ে নয়, সততা নিয়ে। যখন কোনও রাজনৈতিক দল তাদের ইস্তাহার বা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষের দুয়ারে যায়, তখন সেটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু যখন সেই একই দল আড়ালে মোটা টাকা দিয়ে ভাড়া করে এমন সব ‘সোশ্যাল মিডিয়া স্টার’দের, যাঁদের রাজনীতির ‘র’ বোঝার ক্ষমতা নেই, অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের অন্ধের মতো অনুসরণ করেন, তখন সেটা আর প্রচার থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় প্রতারণা। আজ তৃণমূলের হয়ে যে ভ্লগার উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে কাল হয়তো তিনিই বিজেপির হয়ে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ-এর বুলি আওড়াবেন, যদি দর একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই যে আনুগত্যের নিলাম এবং মতাদর্শের ভোল বদল- এটাই আজকের রাজনীতির সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি।

তৃণমূল কংগ্রেসের কথাই ধরা যাক। আঞ্চলিক দল হলেও টাকার অভাব নেই। তাই তো গ্রামগঞ্জে কিংবা চা বাগানেও একেবারে কর্পোরেট ধাঁচে সভা করে বেড়ান দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইসব সভার আয়োজন, খরচ দেখলে আপনার-আমার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। যাকগে সেকথা। এই যে এত বছর ধরে আইপ্যাকের মতো একটি পেশাদার সংস্থা তৃণমূলের হয়ে রণকৌশল ঠিক করছে, তার পেছনে কত খরচ হচ্ছে তা কি আমজনতা জানেন? সেই টাকার উৎসই বা কী, সেই প্রশ্নও কি কেউ করেছেন?

উত্তরটা খুব সহজ। ‘না’।

মমতা বলুন বা অভিষেক, এঁরা সবাই খুব ভালো করেই জানেন, দুর্নীতি বা স্বজনপোষণ নিয়ে বিরোধী কিংবা সাধারণ মানুষের অভিযোগের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া কঠিন। তার চেয়ে অনেক সহজ হল, মানুষের মন ঘুরিয়ে দেওয়া। আর এই কাজের জন্যই প্রয়োজন ইনফ্লুয়েন্সারদের। এঁরা রাজনীতির জটিল কচকচানি বোঝেন না, কিন্তু বোঝেন কীভাবে ৩০ সেকেন্ডের রিলে সরকারের গুণগান গাইতে হয়। তৃণমূল তো ভোটের আগে আবার পুরোদস্তুর সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে। সরকারের কোন প্রকল্পে কী সুবিধা, তা সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘বিশ্বাস অ্যান্ড কোং’ যাত্রাপালার একদল শিল্পী। ফলাও করে সেই সিনেমার প্রিমিয়ারও হয়েছে। দর্শক সেই সিনেমা দেখবেনও। তাঁদেরই কয়েকজন আবার হয়তো সরকারের প্রতি দরদি হয়ে ঘাসফুলে ছাপও দিয়ে ফেলবেন।

গেরুয়া শিবিরই বা কম যায় কীসে! ক’দিন আগে শিলিগুড়িতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ১০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন মোহন ভাগবত। আরএসএস নিঃশব্দে ধর্মের বীজ ছড়িয়ে দেয় সেকথা সকলেরই জানা। সেই সংঘই কিন্তু এবার অন্য পন্থা নিয়েছে। ভাগবতের ওই সভায় ডাক পেয়েছিলেন উত্তরবঙ্গের বহু ইনফ্লুয়েন্সার, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, আইনজীবী। মোহন-মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তাঁদের অনেকেই এখন গেরুয়া রং মাখছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমনই এক পরিচিত ইনফ্লুয়েন্সার, যিনি ওই সভায় ছিলেন তিনিও সম্প্রতি রাষ্ট্র ও গেরুয়া স্বার্থে নানা ভিডিও বানাতে শুরু করেছেন।

রাজনীতিতে অর্থের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কিন্তু আগে সেই অর্থ ব্যবহার হত পেশিশক্তি বা বুথ দখলের কাজে। আর এখন সেই অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে মগজ দখলের কাজে। ইনফ্লুয়েন্সারদের কেনা মানে তাঁদের অনুগামীদের মগজকে লিজ নেওয়া। এক অদ্ভুত হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার গল্প যেন মঞ্চস্থ হচ্ছে বাংলায়। বাঁশিওয়ালারা বাঁশি বাজাচ্ছে (পড়ুন কনটেন্ট বানাচ্ছে), আর লক্ষ লক্ষ ইঁদুররূপী জনতা (পড়ুন ভোটার) মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাদের পেছনে ছুটছে। ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছে এটা শুধুই একটা প্রোজেক্ট।

এখানে সবথেকে বড় হয়ে উঠছে নৈতিকতার প্রশ্ন। একজন ইনফ্লুয়েন্সারের কি কোনও দায়বদ্ধতা নেই? সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের কি কোনও কর্তব্য নেই? টাকার বিনিময়ে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এই যে প্রতিযোগিতা, তা কি সাংবাদিকতার বা জনমত গঠনের কফিনে শেষ পেরেক নয়? অবশ্য, যে সমাজে সবকিছুই পণ্য, সেখানে মতামতও যে পণ্য হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

তবুও, বাংলার ভোটকে কেন্দ্র করে ইনফ্লুয়েন্সার কেনার এই যে নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। এটা রাজনীতির দেউলিয়াপনাকেই প্রকট করে। যখন কোনও দলের কাছে নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের দিয়ে প্রচার চালানোর মতো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না, তখনই তাদের ভাড়াটে সৈন্যদের দ্বারস্থ হতে হয়। আজ তৃণমূল এবং বিজেপি একে অপরকে টেক্কা দিতে গিয়ে যে সংস্কৃতি আমদানি করছে, তা ভবিষ্যতে বুমেরাং হয়ে ফিরতে পারে। কারণ, টাকা দিয়ে কেনা আনুগত্যের মেয়াদ ততক্ষণই, যতক্ষণ পকেট ভারী থাকে। কাল অন্য কেউ বেশি দাম দিলে এই ইনফ্লুয়েন্সাররাই ডিগবাজি খাবেন।
সবশেষে যেটা বলার সেটা হল, বল কিন্তু সাধারণ ভোটারের কোর্টেই। তাঁদেরই ঠিক করতে হবে, তাঁরা কি কোনও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কথায় রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন, নাকি নিজেদের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবেন। ভার্চুয়াল জগতের এই মায়াজাল ছিঁড়ে বাস্তবের মাটিতে পা না রাখলে কিন্তু সমূহ বিপদ।

মাথায় রাখতে হবে, ভোট আপনার নিজস্ব অধিকার। তাই রাজনীতির এই ‘খেলা’য় দর্শক হয়ে হাততালি না দিয়ে, এবার একটু সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। কারণ, খেলাটা যারা খেলছে তারা রাজনীতির ব্যবসায়ী, আর বাজিটা ধরা আপনার আর আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *