ভারতে প্রায় ২১.১ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক নারী রয়েছেন, যাঁদের প্রধান পেশা গৃহস্থালির কাজ। অর্থাৎ, যাঁদের আমরা ‘গৃহবধূ’ বলি। আর চক্ষুলজ্জা এড়াতে ব্যবহার করি গালভরা শব্দ ‘হোমমেকার’। বহু ক্ষেত্রে যোগ্যতা সত্ত্বেও অনেকেই বিয়ের পরে পরিবারের কারণে বহির্জগতের কাজের সঙ্গে যুক্ত নন, হতে পারেন না। আবার অনেকে ‘সংসার করা’-কে ‘লক্ষ্য’ হিসাবে বেছে নিয়েছেন। একজন ভারতীয় গৃহিণী গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন। যা ভারতের জিডিপি-তে বিশাল অবদান রাখলেও অর্থনৈতিক মূল্যায়নে এখনও উপেক্ষিত। ফলে, সংসারে কিছুটা অবজ্ঞা-উপেক্ষা ও অবহেলা সহ্য করেই তাঁদের চলতে হয়। পরিবারে কর্মরতা
মেয়েদের সম্মান ও অধিকার বেশি থাকে।
পুরুষ সদস্যরাও আর্থিক বিষয়ে সময়ে-সময়ে তাঁদের বিলক্ষণ খোঁটা দিয়ে থাকে। যদিও গৃহিণীদের কাজ একদিন ঘাড়ে পড়লে প্রত্যেকের ‘নাভিশ্বাস’ ওঠে। কিন্তু তার পরেও স্বীকৃতি দিতে আমাদের অনেক কুণ্ঠা, দ্বিধা। ভারতের ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। প্রতিদিন ৬১ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেন। স্বামীর অবহেলা, নির্যাতন, শ্বশুরবাড়িতে অবহেলার শিকার হয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন অগণিত নারী, স্বাধীনভাবে তাঁদের চলাচলের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। জীবনের একটি পর্যায়ে কোনও স্বপ্ন বা উচ্চাশা আর থাকে না। যার পরিণতিতে জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
অথচ সমাজের ‘অর্ধেক আকাশ’-কে পিছনে রেখে নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ তকমা দিতে দু’বার ভাবতে হয় না আমাদের। এই ‘পিতৃতান্ত্রিক’ মানসিকতা কি সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় বদলে ফেলতে পারবে?
ঠিক এই আবহেই একটি যুগান্তকারী রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গৃহিণীদের ‘জাতির নির্মাতা’ বা’ নেশন বিল্ডার্স’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। পথ দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের মামলায় হিসাব করতে গিয়ে বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন. কোটিশ্বর সিংয়ের বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় কোনও গৃহিণীর মৃত্যু হলে গৃহস্থালি ও পরিচর্যা পরিষেবার ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রতি মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা হিসাবে গণ্য করতে হবে।
অর্থাৎ, অতীতে যেখানে গৃহিণীদের কাজকে প্রায়শই অদক্ষ শ্রমিক বা তাঁর চেয়েও কম মূল্যের শ্রম হিসাবে ধরা হত, সর্বোচ্চ আদালত সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ খারিজ করেছে। স্বীকৃতি দিয়েছে তাঁদের অবদানকে। আদালত জোর দিয়ে বলেছে যে সন্তান লালনপালন, পরিবারের যত্ন নেওয়া এবং গৃহস্থালির কাজের মাধ্যমে নারীরা সমাজ ও দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদে যে অদৃশ্য অবদান রাখেন, তা কোনও অংশেই কম নয়।
যে কোনও সভ্য দেশে এমনই নীতি কাম্য। অথচ সমাজের ‘অর্ধেক আকাশ’-কে পিছনে রেখে নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ তকমা দিতে দু’বার ভাবতে হয় না আমাদের। এই ‘পিতৃতান্ত্রিক’ মানসিকতা কি সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় বদলে ফেলতে পারবে? সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায় থাকা ছাড়া আপাতত পথ নেই। ‘হোমমেকার’ থেকে ‘নেশন বিল্ডার্স’ অবধি যাত্রাপথ কঠিন হবে না সমাজের সর্বস্তরের সম্মতি ও যোগদান থাকলে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
