হোক না ডেস্টিনেশন কুমাই – Uttarbanga Sambad

হোক না ডেস্টিনেশন কুমাই – Uttarbanga Sambad

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


  • শানু শুভঙ্কর চক্রবর্তী

সন্ধে নেমেছে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ঢলে পড়ার সময় রংটা আরও লাল। দাওয়ায় বসে লাল চা আর মাশরুমের পকোড়ার সঙ্গে আড্ডাটা তখন জমাট বেঁধেছে। চারপাশের আদিগন্ত সবুজ চা বাগানের অতীত, বর্তমান, ঋতু বদলের সঙ্গে প্রকৃতির রং পালটানোর নানা গল্পের যেন শেষ নেই। ডুয়ার্সের এই চা বলয়ে জমে থাকা গল্প থেকে নতুন নতুন তথ্য জানারও শেষ হয় না কখনও। বারবার আড্ডা দিলেও আরও নতুন কাহিনীর ভিড় জমে।

পাহাড়ে জলদি খাওয়ার নিয়ম। ডিনারের ডাক পড়ে যায় রাত ৯টা বাজতেই। ডিনারের মেনুতে একেবারেই শহুরে ছোঁয়া নেই। থাকলে পরিবেশের সঙ্গে মানাতও না। কলাই ডাল, আলু সেদ্ধ আর মুরগির মাংস। সে মাংস আবার স্থানীয় রেসিপি মেনে রান্না করা। যার স্বাদ একেবারে ভিন্ন ধরনের। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে এই কুমাই।

খাওয়ার পর রাতে আর কিছু করার নেই। বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া ছাড়া। শহুরে অভ্যাসে ঘুম আসতে দেরি হয়। অভ্যাসে মোবাইল নিয়ে খুটখাটের মধ্যে কানে ভেসে আসে ময়ূরের ডাক। দূরে কোথাও। কিন্তু এত রাতে? হয়তো লেপার্ড দেখেছে। তাই অ্যালার্ম কল ময়ূরের। তবে সেই ডাক শুনতে শুনতে মনোরম পরিবেশ নিমেষে ঘুমটা নেমে আসতে দেরি হয় না।

বৃষ্টি হলেও শহরে এখন চিটচিটে গরম। কখনও গা পুড়িয়ে দেয়। ঘামে গা চপচপ করে। শহরের পাশে যে তিস্তা নদী, তার পাড়ে গেলেও খুব একটা স্বস্তি মেলে না সবসময়। ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে বেশ কিছু পরিচিতি গড়ে উঠেছে ডুয়ার্সজুড়ে। একটু হাওয়াবদলের জন্য তাই ডায়াল করেছিলাম। ওপাশ থেকে উত্তর এসেছিল, ‘য়হাঁ পে তো হর রোজ বারিষ হো রহা হ্যায়।’

ব্যাস! পরের দিন ঘুম ভাঙতেই চা খেয়ে বাইকে যাত্রা শুরু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কুমাই। অনেকে বলে থাকেন কুমানি। জলপাইগুড়ি শহর থেকে তিস্তা ব্রিজ ছাড়িয়ে দোমোহনি, ক্রান্তি মোড়, লাটাগুড়ি, বাতাবাড়ি ছড়িয়ে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে চালসা পৌঁছানো যায়। দূরত্ব আনুমানিক ৭৩ কিমি। জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। নিজস্ব বাহন না থাকলেও পরোয়া নেই। স্থানীয় গাড়ি করেও এই জায়গায় পৌঁছানো যায়।

জলপাইগুড়ি থেকে যেতে চাইলে মালবাজারের বাসে চেপে চালসাতে নেমে স্থানীয় গাড়ি পাওয়া যায় বটে। তবে আগে থেকে যোগাযোগ করে রাখলে ভালো। কারণ গাড়িগুলির নির্দিষ্ট সময় আছে। তাছাড়া মাল জংশন, বাগডোগরা বিমানবন্দর বা নিউ জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি থেকে সড়কপথে যাওয়া সম্ভব।

চালসা মোড় থেকে ডাইনে ঘুরে খুনিয়া মোড়। সেখান থেকে চাপড়ামারির দিকে। জঙ্গলে আস্তে গাড়ি চালানোই ভালো। উচিতও। হঠাৎ কোনও বুনোর দর্শন পাওয়া গেলেও যেতে পারে। যথারীতি পাতার খসখসানির শব্দে চোখ যেতে পারে জঙ্গলের দিকে। অন্তত দুটো স্পটেড ডিয়ার নিজের ছন্দে ঘুরতে তো দেখা যাবেই। চাপড়ামারির রাস্তায় মাঝে মাঝে ইয়েলো থ্রোটেড মার্টিন, লেপার্ডের দর্শনও হয়ে যেতে পারে। তবে তা ভাগ্যের ব্যাপার।

খুনিয়া মোড় থেকে প্রায় ১০ কিমি গেলে ঝালং মোড়। একটু বিরতি নেওয়াই যায়। বাইকে গেলে জিরিয়ে নিতে ইচ্ছা করে। তাছাড়া দীর্ঘক্ষণ গাড়িই চালান বা বাইক, খিদে পেয়ে যায়। একটু বেশি খিদেই যেন। ঝালং মোড়ে দাঁড়ালে মোমো, থুকপা খাবেন না- এমন হয় নাকি! এসব খাবারের স্বাদ জিভে লেগে থাকে। এক প্লেট থুকপা খেতে খেতে মনে হবে, আরে, এই মোড়ে তো প্রায় প্রতিদিন হাতি চলে আসে। গা ছমছম করবে। মাঝে মাঝে এই দোকানেও হামলা করে যে।

আর দেরি নয়, এরপর বাঁদিক ঘুরে সোজা হোমস্টে’র দিকে। কুমাই চা বাগানের ভেতর কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ বটে, তবে এটুকু সয়ে নিয়ে বেশিরভাগ পথটাই ভালো। চা বাগানের ভেতর রাস্তাটা বেশ সুন্দর। হোমস্টেতে ওদের নিজস্ব পার্কিং আছে। গাড়ি বা বাইক নিয়ে গেলে সমস্যা নেই। খানিক বিশ্রাম নিয়ে লাঞ্চের পর পথের ক্লান্তি কোথায় যে পালিয়ে যাবে!

কোথাও বেড়াতে গেলে আমি সাধারণত স্থানীয় খাবার বেশি পছন্দ করি। ডুয়ার্সের চা বাগিচা এলাকায় গিয়ে সেইসব মেনু চেখে দেখব না- তা আবার হয় নাকি! কাজেই গুন্দ্রুক-এর ডাল (রাই শাক শুকিয়ে বানানো এক বিশেষ স্থানীয় খাবার), আলু ভাজা আর স্থানীয় পদ্ধতিতে তৈরি ডিমের কারি। ভরপেট খেয়ে, হোমস্টে’র ব্যালকনিতে নীরবে বসে থাকার অনুভূতিই অন্যরকম।

সামনে প্রশস্ত চা বাগান আর জঙ্গল। ১৮০ ডিগ্রি ভিউয়ে বাঁদিকে ভুটানের কিছু অংশ, সামনে মেটেলি, সামসিং, লালিগোরাসের বুক চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে মূর্তি নদী। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। প্রকৃতি নিজের কাব্য লেখে বৃষ্টির ফোঁটায় আর ঝমঝম নয় ঝিরঝির শব্দে। ব্যালকনি থেকে কোথাও উঠতে ইচ্ছা হবে না। অলস বিকেল। কিন্তু প্রাণে অদ্ভুত ভোর যেন।

প্রকৃতির সঙ্গে আপন মনে কথা কইবার এমন সুযোগ কি কেউ ছাড়ে। রোমাঞ্চের হাতছানি। ইচ্ছে হলে ভিজে আসা যায়। শুধু সাবধান থাকতে হয়, বাড়ি থেকে এত দূরে এসে জ্বর বাধিয়ে বসলে বিপদ। মাথা কুটলও আশপাশে ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধের দোকান পাবেন না। তবে চিন্তা নেই। হোমস্টে যে পরিবারের, তাদের আন্তরিকতা বিপদে পড়তে দেবে না। চাই কী শুশ্রূষাও মিলবে।

চারপাশ দেখতে দেখতে আর নানা কথা ভাবতে ভাবতে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কালো মেঘের সমারোহে ধীরে ধীরে সন্ধে নামবে। দূরে দেখা দেবে মালবাজার, ওদলাবাড়ির শতসহস্র আলোকবিন্দু। একদিনের জন্য বেড়াতে যেতে চাইলে জলপাইগুড়ি জেলার এই কুমাই একদম আদর্শ জায়গা। তা বলে ভাববেন না, শুধু হোমস্টে’তে শুয়েবসে দিন কাটাতে হবে।

চাইলেই বেরিয়ে পড়া যায়। সাইটসিইংয়ের অনেক জায়গা। তবে একদিন নয়, অন্তত দু’দিন হাতে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই চাপড়ামারি অভয়ারণ্য, মেটেলি পাহাড়, হাট, লালিগুরাস, রকি আইল্যান্ড, সুনতালেখোলা, ঝালং, বিন্দু, তোদে-তাংতা ইত্যাদি মন খুলে ঘুরে বেড়ানোর গন্তব্য কম নয়। বছরের যে কোনও সময় যাওয়া যেতে পারে। কোনও বাধা নেই।

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কিংবা শরৎ-হেমন্ত-বসন্ত, ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ কুমাইয়ের। তবে বর্ষাকালে কিংবা পূর্ণিমার রাতের মোহময়ী সৌন্দর্যের একবার প্রেমে পড়লে বারবার আসতে ইচ্ছা করবে। পাহাড়ের সকালটাও বেশ মোহময়। গরমকালেও চারদিকে যেন কুয়াশার ভাব। নানা পাখির কলরব। কুহুতান শুনতে শুনতে খুব সকালেই ঘুম ভাঙবে।

বেড়ানো শেষ করতে সকালসকালই ভালো। চটজলদি ব্রেকফাস্ট সেরে পাখির কূজন শুনতে শুনতে ও আবার জঙ্গলপথে বুনো দর্শনের সম্ভাবনা নিয়ে বাড়ি ফেরা যায়। স্মৃতি থেকে যায় অনেকদিন। কাজের চাপে হাঁসফাঁস করতে করতে একদিন মনটাকে ফ্রেশ করে ফেরা যায়। তাহলে হোক না একদিন ডেস্টিনেশন কুমাই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *