হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে

হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে

শিক্ষা
Spread the love


বিপুল দাস

হ্যাঁ, নামটা সুনীতা বলেই হয়তো মনে হচ্ছে স্বর্গভ্রষ্ট এক দিগবালিকা ফিরে এসেছে ধরার ধুলায়। সুনীতা, অনীতা, বিনীতা, নমিতা– এরা তো চিরকাল আমাদের ঘরের মেয়ে। সে যতকাল এই শ্যামল সবুজ ঘরের টান এড়িয়ে মহাশূন্যে ভেসে ছিল, আমাদের ভাবনা হয়েছে। ওঁর জন্য দুশ্চিন্তা হয়েছে। ঘরের মেয়ে দূর প্রবাসে গেলে যেমন হয় বাপমায়ের। আহা, মেয়েটা কবে ফিরবে। কেমন আছে অনি।

ন’মাস পৃথিবীর আকর্ষণ অগ্রাহ্য করে আশ্চর্য এক শারীরিক, মানসিক অবস্থায় কাটাল সুনীতা। চিরকালের চেনাজানা সংসারের বাইরে, ধুলো ও ধোঁয়ার বাইরে, ট্রেন-ট্রাম-বাস নেই, নেই আশপাশে পরিচয়জ্ঞাপক কোনও চিহ্ন, হলুদ বিল্ডিং নেই, স্কুল-কলেজ-থানা-পোস্টাপিস-হাসপাতাল নেই, বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে যাপন, সঙ্গে নিজের পরিচিত ভুবনে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তা, এমন কথা ভাবলে আমাদেরই বুকের ভেতরে ‘হারিয়ে গেছি আমি’ এমন সতর্কবার্তা লাগু হয়। শীতল ভয়ের একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে বুকের ভেতরে। কোথাও কোনও পরিচিত চিহ্ন খুঁজে না পেলে এই মহাবিশ্বে হারিয়ে যাওয়ার ভয় বিপজ্জনক কেরোসিন তেলের মতো ছড়িয়ে পড়ে অস্তিত্বজুড়ে। তখন কূলহারা, কম্পাসহীন নাখোদা একটা লাইটহাউসের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আমাদের মেয়ে সুনীতারও কি তেমন মনে হয়েছিল। সুনীতাকে আমরা কখন যেন অবচেতনেই আমাদের মেয়ে করে নিয়েছি। অথচ ঘরে ফিরেছে কিন্তু চারজন।

আমরা টলতে টলতে হাঁটতে শিখি। মাটির টানের সঙ্গে এই শরীরের ভারসাম্য রাখা শিখি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাই কাঁটা ও কাচ ছড়ানো পৃথিবীর ধুলোপথে। বড় মায়ায় ভরা এই ভুবন। আমাদের সবুজ গ্রহ। নদী, ঝরনা, পাহাড়, পাখির গান, উজ্জ্বল ফুল, প্রিয়জনের ভালোবাসা, নক্ষত্রময় আকাশ– এসবের মাঝে বিস্ময়ে প্রাণ জেগে ওঠে। ধুলোমাটির এই পথ, এই অরণ্য, এই পলাশ বড় সুন্দর। ভালোবাসার পৃথিবীর মাটি শরীরে মাখতে ইচ্ছে করে। যেন স্নিগ্ধ চন্দনের প্রলেপ। এসব ছেড়ে কতদিন মহাশূন্যে থাকা যায়। দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে কিছুদিন বাদেই ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। চেনা জগতের বাইরে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাওয়ার পর ক্লান্তিকর একঘেয়েমি গ্রাস করে আমাদের। তবুও আমরা নতুন জায়গাতেও হেঁটেচলে বেড়াই, দোকানে বসে চা খাই, নতুন লোকজনের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। কিন্তু যদি আমাদের থাকতে হয় পৃথিবী থেকে বহুদূরে মহাশূন্যে ভাসমান অবস্থায়, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, সেখানে ভুঁইয়ের টান নেই, পরিচয়ের কোনও চিহ্ন নেই, আর কোনওদিন ঘরে ফেরা হবে কি না– তার নিশ্চয়তা নেই, তবে কেমন লাগবে আমাদের। আমাদের তো সেই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার অনুশীলন করা নেই। সুনীতার ছিল, তাই সে পেরেছে। আমরা যা পারি না, অন্য কেউ সে কাজ পারলে আমাদের বীরপুজোর প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। তার ওপর যদি সে হয় ভারতীয় বা বাঙালি নামের কোনও মেয়ে, মুহূর্তেই তাকে আপন করে নিই আমরা। যেন এই দমদম, বাঁকুড়া বা শিলিগুড়ির কোনও মেয়ে। তার নিরাপদ ঘরে ফেরার জন্য ভেতরে ভেতরে অবচেতনেই আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। সুনীতা উইলিয়ামসের জন্য এই কারণেই সমস্ত ভারতবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল। শুধু ভারতীয় বংশোদ্ভূত বলে নয়, তাকে কখনও ভারতীয়ই মনে করেছি হয়তো।

কতদিন পর সুনীতাকে পৃথিবী আবার তার কেন্দ্রের দিকে টানবে। দ্বিতীয় শৈশবে ফিরে গিয়ে আবার সে হাঁটা শিখবে। চেনা জগতে ফিরে আবার সে দেখবে ওই তো তার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, ওই যে চেনা গাছের সারি, মাথার ওপরে চিরকালের চেনা নীল আকাশ, বড় মায়ার টান মাটির। স্বাগতম সুনীতা। তুমি তো আমাদেরই মেয়ে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *