‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ বলেই নেহরুর পিঠে ‘ছুরি’! মোদির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফের রং বদলাবেন জিনপিং?

ইন্ডিয়া খবর/INDIA
Spread the love


শুভদীপ মল্লিক ও রমেন দাস: সালটা ১৯৬২। তখন দিল্লির বুকে গমগম করে ধ্বনিত হচ্ছে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ স্লোগান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিশ্বাস করতেন, একমাত্র মৈত্রীই এক সুতোতে বাঁধবে এশিয়ার অন্যতম বড় দুই দেশকে। কিন্তু তথাকথিত সেই ‘বন্ধুত্বে’র আড়ালে সীমান্তে তৈরি হচ্ছিল এক ভিন্ন সমীকরণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে যায় নেহরুর সাধের সেই ‘সুতো’। পিঠে ছুরি মেরে সীমান্তে ভারতীয় চৌকিগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিনা হানাদার বাহিনী। নেহরুর ‘পঞ্চশীল’ ধুলোয় মিশিয়ে নিজের স্বরূপ দেখায় ‘লাল’ চিন। অতীতের সেই সমস্ত ‘শিক্ষা’ নিয়েই আজ, শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে দিল্লিতে বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

১৯৬২-র সেই যুদ্ধের পরেও অবশ্য থামেনি ভারত-চিন সংঘাত। কখনও সীমান্তে মুখোমুখি দু’দেশের সেনা, কখনও বা আবার কূটনৈতিক টানাপোড়েন – বারবারই অশান্ত হয়ে উঠেছে হয়েছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি)। ১৯৬৭ সালে সিকিমের নাথু লা ও চো লা-তে ফের সংঘর্ষে জড়ায় দুই দেশের সেনা। তবে এবার অভূতপূর্ব সাফল্যে লাল ফৌজকে পিছু হটতে বাধ্য করে ভারত। এরপর ধীরে ধীরে কেটেছে একটার পর একটা বছর। সময়ের সঙ্গে ভারত-চিন সম্পর্কের সমীকরণ কিছুটা বদলালেও সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।

আরও পড়ুন:

১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার। ভারত মণ্ডপমে ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিঙের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিটিআই।

২০১৭ সালে দু’দেশের বিবাদে ফের রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে ডোকলাম। ডোকলাম নিয়ে প্রায় যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ভারত-চিন সীমান্তে। দু দেশের সেনা একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করে থাকায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকে। সেনা তৈরি থাকলেও সমান্তরালভাবে শান্তির লক্ষ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। টানা ৭৩ দিন দু’দেশের সেনা মুখোমুখি অবস্থান করার পর পিছু হটে বেজিং।

এরপর ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে (মহাবালিপুরম) ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ করেন মোদি ও জিনপিং। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, সীমান্ত শান্তি-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয় দুই রাষ্ট্রপ্রধানের। কিন্তু মামাল্লাপুরমের সেই বন্ধুত্বের ছবি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ঠিক তার পরের বছরই পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ভারত ও চিনা সেনারা। দু’পক্ষের জওয়ানরাই লোহার রড ও কাঁটাতার জড়ানো হাতিয়ার নিয়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা লড়াই করে। রক্তক্ষয়ী সেই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় জওয়ান শহিদ হন। ১৯৭৫ সালে পর সেই প্রথম প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পরেই সীমান্তে ফের যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও দুই দেশের সেনাবাহিনীর দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার। ভারত মণ্ডপমে ঐক্যের বার্তা নরেন্দ্র মোদি, ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিঙের। ছবি: পিটিআই।

অর্থাৎ, ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাচ্ছে, কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা, দু’দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাতের পরও বারবার রঙ বদলেছে বেজিং। এই পরিস্থিতিতে শনিবার ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চে নরেন্দ্র মোদি এবং শি জিনপিঙের করমর্দন কি নিছকই সৌজন্য, দু’দেশের সম্পর্ক উন্নতির বার্তা নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে তথাকথিত চৈনিক চাল? কারণ, অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে ভারত-চিনের। অরুণাচল নিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় ‘ড্রাগন’। তবে বলা বাহুল্য পালটা চাল দিচ্ছে ভারতও। নয়াদিল্লি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সত্য বদলাবে না। 

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ বলে নেহরুর পিঠে যেভাবে ড্রাগন ‘ছুরি’ মেরেছিল, তা মোদির ক্ষেত্রে তা করা কঠিন। কারণ, তৎকালীন নেহরু সরকার এবং বর্তমান মোদি সরকারের আমলের পরিস্থিতির মধ্যে কৌশলগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। সরকারের অন্যতম বড় ‘অস্ত্র’ রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। একাধিকবার চিন সফর করেছেন তিনি, যা বেজিঙের ‘পালস’ বুঝতে সাহায্য করছে নরেন্দ্র মোদিকে। তাছাড়া বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবে কোণঠাসা হচ্ছে একের পর এক দেশ। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটা দেশই এখন চাইছে মার্কিন ‘আধিপত্যবাদে’র বিরুদ্ধে একজোট হতে। সেই আবহে ভারতের পিঠে ‘ছুরি’ মারার মতো বড় ভুল করবে না বেজিং।

এ প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক (ড.) ইমনকল্যাণ লাহিড়ী বলেন, “বর্তমানে হরমুজ প্রণালী, মালাক্কা প্রণালী সমস্ত কিছুতেই মার্কিনি প্রভাব রয়েছে। এর জেরে বাড়ছে তেলের দাম। বিপন্ন হচ্ছে বাণিজ্য। সেই আবহে  ব্রিকসে ভারত-চিন বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দু’দেশের সম্পর্ক ঠিক থাকলে, পরাজিত হবে আমেরিকার আগ্রাসী নীতি। আমেরিকায় দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির কারণে কোণঠাসা হচ্ছে বহু দেশ। সেখানে ভারতের বিকল্প বন্ধু খুঁজে বের করা একান্ত প্রয়োজনীয়।” কিন্তু ভারত-চিনের বন্ধুত্বে কি ঘুম উড়বে পাকিস্তানের? অধ্যাপক (ড.) ইমনকল্যাণ লাহিড়ী বলেন, “পাকিস্তানকে নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই। আমাদের প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ। বর্তমানে যা পরিস্থিতি তাতে আত্মরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা দিকে নজর রাখা একান্ত প্রয়োজনীয়।

১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার। ভারত মণ্ডপমে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান এবং শি জিনপিঙের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিটিআই।

অন্যদিকে, বহু বছর ধরেই ভারত মহাসাগরের আশপাশে বন্দর এবং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে চিন। বলা চলে কার্যত একটা ‘চেইন’ গড়ে তুলে ঘিরে ফেলছে ভারতকে। ‘ড্রাগনে’র এই কৌশলই ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ বা ‘মুক্তোর মালা’ নামে পরিচিত। পাকিস্তান থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা বন্দর – একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রে বেজিংয়ের উপস্থিতি চিন্তা বাড়িয়েছে ভারতের। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই কেন্দ্রগুলিকে নিজেদের সামরিক সুবিধা হিসাবেও ব্যবহার করতে পারে বেজিং।

তাই পালটা কৌশলে ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্সের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়িয়েছে ভারত। সেই দেশগুলির সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি ফিলিপিন্সকে অত্যাধুনিক ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে নয়াদিল্লি। শুধু তাই নয়, শনিবার ব্রিকসে ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং-এর সঙ্গে পার্শ্ববৈঠকও করেছেন মোদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসবের অর্থই হল চিনকে চাপে রাখার কৌশল।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *