হারানো সুযোগ নাকি নতুন দিগন্ত?

হারানো সুযোগ নাকি নতুন দিগন্ত?

শিক্ষা
Spread the love


 

  • অভিষেক বোস 

সমুদ্র নাকি সব ফিরিয়ে দেয়। এমনকি যা কিছু আমাদের থেকে কোনওদিনও নেয়নি, যা কিছু আমাদের পাওয়ার কথা নয়, সেসব কিছুও। মানচিত্রের দিকে চোখ পড়লে বঙ্গোপসাগর মানে অনেকটা জায়গাজুড়ে শুধুই নীল রং। যে রঙের কাজ, দুটো ভূখণ্ডকে আলাদা করা। কিন্তু ওই নীল সমুদ্রের তলাতেই আছে আগামীর হাতছানি। বিশাল জলরাশিতেই লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আর রাজনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি। আজ যখন ‘ব্লু ইকনমি’ শব্দটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে, তখন প্রশ্ন উঠে আসছে, বঙ্গোপসাগর কি শুধুই উপকূলের মানুষের জীবিকার ভরসা, নাকি পুরো দেশের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি!

সমুদ্রের অতলে কী লুকিয়ে?

সাগরের গভীরতা মহাকাশের মতোই এক রহস্যময় অধ্যায়। আমরা যখন মাটির নীচে সমস্ত খনিজ সম্পদ অকাতরে অপচয় করে আগামীর কথা ভেবে শঙ্কিত, এমনকি চাঁদের বুক থেকে খনিজ পদার্থ তুলে আনার কথা ভাবছি, তখন সমুদ্র আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। পলিমেটালিক নোডুলস ও কোবাল্ট ক্রাস্ট  সমুদ্রের তলায় নুড়ির মতো দেখতে, ছোট ছোট পাথুরে পিণ্ড থাকে, যাকে বলা হয় ‘পলিমেটালিক নোডুলস’। এই নোডুলসের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে জমা থাকে ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, কোবাল্ট, তামার মতো ধাতু।

যদিও ভারতের প্রধান নোডুলস রিজার্ভ মধ্য ভারত মহাসাগরে রয়েছে, তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় আন্দামান সাগর এবং সংলগ্ন গভীর এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কোবাল্ট রিচ ক্রাস্ট মিলেছে। আমাদের প্রতিদিনের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা গ্রিন কারের ব্যাটারি তৈরির জন্য এই কোবাল্ট ও নিকেল অপরিহার্য।

ভবিষ্যতের বরফ জ্বালানি (গ্যাস হাইড্রেট)

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অবস্থিত বেঙ্গল ফ্যান পৃথিবীর সব থেকে বড় পলি সমভূমি। হিমালয় থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত পলি, গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গে বয়ে এসে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমে, এই বিশাল অঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ঠিক পাশেই ওডিশা-বাংলা উপকূল অঞ্চলে সমুদ্রের তলায় জমাট বাঁধা বরফের মতো বিশাল বিশাল গ্যাস হাইড্রেটের ভাণ্ডারের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। এই গ্যাস হাইড্রেট আসলে অত্যন্ত ঘন মিথেন গ্যাস। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত যদি সফলভাবে এই গ্যাস উত্তোলন করতে পারে, (যদিও এই মুহূর্তে সেটা রীতিমতো ব্যয়সাপেক্ষ এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল) তবে আগামী বেশ কয়েক দশকের জন্য আমাদের তেল ও গ্যাসের আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশেই কমে আসবে। এই মুহূর্তের ভূ–রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর। সঠিক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যবহৃত হলে, এই বরফের জ্বালানি অনেকাংশেই প্রচলিত জ্বালানির থেকে কম দূষণ করে।

বালুকাবেলায় সোনার রেণু

বালির মধ্যে সোনার রেণু খুঁজে পাওয়া নাকি ভীষণ কঠিন! তবে টাইটানিয়াম ও জিরকন ঠিক অতটাও কঠিন না।  দিঘা, বকখালি এবং সাগরদ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চলে যে বালি পাওয়া যায়, তা কেবল সাধারণ বালি নয়। এই বালিতে ইলমেনাইট এবং জিরকনের মতো খনিজ পদার্থ থাকে। এইজন্য এধরনের বালিকে বলা হয় ‘হেভি মিনারেল রিচ স্যান্ড’। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে এই মিনারেল সমৃদ্ধ বালুকারাশি থেকেই নীল অর্থনীতির সূচনা হতে পারে। প্রসঙ্গত, অতুলনীয় power to weight ratio-র জন্য টাইটানিয়াম দিয়ে বিমান থেকে শুরু করে মহাকাশযানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি করা হয়।

হাতের বালিটা ফেলে দেবেন না। ওর মধ্যেই আছে মোনাজাইট। দেশের পরমাণু শক্তি কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় যে থোরিয়াম, তার আধার হল এই মোনাজাইট। পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশা উপকূলে এই সম্পদের সঠিক উত্তোলন, পূর্ব ভারতে নতুন এক শিল্প দিশার দিশারি হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে দলীয় কোন্দল আর ক্ষুদ্র আঞ্চলিক স্বার্থকে পেছনে সরিয়ে রাখতে হবে।

মৎস্য ৬০০০

ভারতের বিজ্ঞানকেন্দ্রগুলো এখন মহাকাশ জয়ের পাশাপাশি, সমুদ্র জয়েও বদ্ধপরিকর। ২০২৬ সাল নাগাদ, ভারত Deep Ocean Mission পরিকল্পনা শুরু করেছে। মৎস্য ৬০০০ ভারতের তৈরি প্রথম মানববাহী গভীর সমুদ্রযান। চলতি বছরই এটি ভারত মহাসাগরের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের ৬০০০ মিটার নীচে তিনজন অভিযাত্রীকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মহাকাশের মতো সমুদ্রের অতলের খোঁজ পাওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এর ফলে বিশেষজ্ঞরা সমুদ্রতলের খনিজ মানচিত্র তৈরি করার পাশাপাশি  সমুদ্রে ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাবগুলো খতিয়ে দেখতে পারবেন।

পূর্ব ভারতের নতুন করিডর

পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের রাজ্যকে বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বারে পরিণত করেছে। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর এখন আর কেবল মাল ওঠানো নামানোর জায়গা নয়। বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাল্টি মোডাল লজিস্টিক্স হাব হিসেবে গড়ে উঠছে। গঙ্গা নদীর নাব্যতা ও বঙ্গোপসাগরকে যুক্ত করে পণ্য পরিবহণের খরচ কমানোর কাজ চলছে।  দক্ষিণবঙ্গ থেকে খুব সহজে এবং অনেক কম খরচে দেশের মধ্যে ও দেশের বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। পরিবর্ত পরিস্থিতিতে এবং রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগের ফলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য এক বিশাল বাজার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লাল নীল সবুজের মেলা

মনে রাখতে হবে, ব্লু ইকনমির একটি বড় অংশ হল ব্লু কার্বন। সামুদ্রিক উদ্ভিদ, সামুদ্রিক ঘাস ও ম্যানগ্রোভ, স্থলভাগের বনের চেয়ে অনেক বেশি কার্বন শোষণ করতে সক্ষম। এই কার্বন ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে পশ্চিমবঙ্গের বিপুল রাজস্ব আয় করার রাস্তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা আর প্রয়োগ। খনিজ উত্তোলনের পাশাপাশি এটা ভুলে গেলে চলবে না, উন্নয়ন আর পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে বঙ্গোপসাগর আমাদের দীর্ঘদিনের রক্ষাকবচ। যাকে আমরা ক্রমাগত নষ্ট করে চলেছি। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ না থাকলে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণভাগ তছনছ হয়ে যেত।

সমুদ্রের জলস্তর বাড়লে নোনা জল সমুদ্র উপকূলবর্তী চাষের জমিতে ঢুকে পড়ে। তাই সমুদ্রের খনিজ আহরণ বা বন্দর তৈরির সময় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের মাত্রাতিরিক্ত লোভের কারণে যেন উপকূলীয় মানুষের কৃষি ও জীবিকা নষ্ট না হয়। বিগত দিনগুলোতে খনিজ আহরণের সময় যে ভুলগুলো আমরা ক্রমাগত করে এসেছি, করে চলেছি, তার পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়। ক্ষমা মানুষের মধ্যেই চলে। প্রকৃতি কখনোই ক্ষমা করে না।

ভূ-রাজনীতি ও আধিপত্যের লড়াই

যেখানে সম্পদ, সেখানে রাজনীতি থাকবেই। সামান্য পরিবারের মধ্যেও সম্পদ নিয়েই লড়াই হয়। আর এখানে তো অগাধ ঐশ্বর্য। চিন নিয়মিতভাবে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালেই যার উদাহরণ চোখে পড়বে। ভারতের জন্য তাই সাগরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কেবল অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই অঞ্চলে ভূ-প্রাকৃতিকভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতের বিনিয়োগের পরিবেশ সুরক্ষিত হবে। এবং সমগ্র এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।

বঙ্গোপসাগর শুধু কোনও বিনোদনের জায়গা নয় অথবা সুদূর বিস্তৃত জলরাশি নয়। বঙ্গোপসাগর ভারতের ভবিষ্যৎ শক্তি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্লু ইকনমি যদি সঠিক পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে এগোয়, তবে সমুদ্রই হতে পারে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই নীল ভবিষ্যৎ, আরও একবার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। তবে ভুললে চলবে না, গভীর সমুদ্র যতটা শান্ত ঠিক ততটাই উত্তাল। সমুদ্র শুধুই সম্পদের আধার নয়, এই সুযোগ আমাদের দূরদর্শিতারও পরীক্ষা। আমাদের বিচক্ষণতার পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নীল দিগন্তের হাতছানি আমরা কীভাবে গ্রহণ করি, কীভাবে পরিবেশবান্ধব, সময়োপযোগী পরিকল্পনার রূপায়ণ করতে পারি, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামীর পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সুনীল ভবিষ্যৎ।

(লেখক প্রাবন্ধিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *