সুনীতা দত্ত
আজকের দুনিয়ায় শিবরাম চক্রবর্তীর রচনা, সাহিত্য খুবই প্রাসঙ্গিক। জীবনদর্শনও। শেষ জীবনে অনেক কষ্টের দিন কাটাতে হয়েছে তবু ‘ফার্স্ট ক্লাস আছি’ বলতে কখনোই দ্বিধা করতেন না। একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একজন এসে বলেছিলেন- ‘জানেন, শিবরাম চক্রবর্তীকে দেখলাম ফুটপাথে শুয়ে আছেন।’ সুনীল ব্যস্ত হয়ে সেখানে চলে গেলেন দল বেঁধে। শিবরামকে বললেন, ‘কী হয়েছে? শরীর খারাপ হয়েছে নাকি আপনার?’ সকলকে দেখে একটু বিচলিত হলেও শিবরাম কিন্তু হাসিমুখে বললেন, ‘না, না ভালোই আছি। হঠাৎ মনে হল ফুটপাথে শুয়ে আকাশ দেখি।’ তিনি এমনই ছিলেন। সামান্য অনাদর হলেই এ যুগের মানুষ যখন প্রচণ্ড হতাশ, সেই সময় আমাদের খুব চেনা শিবরাম কিন্তু অচেনা অন্য এক দিশা দেখান।
পোশাকি নাম চঞ্চল হলেও তিনি শিবরাম নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। অসামান্য লেখনশৈলী। শেষ জীবনটা অবশ্য প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে কাটিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তাঁর দিনযাপনের আশ্রয় ছিল সরকার কর্তৃক ৬০০ টাকা মাসোহারা। অথচ জন্ম এক জমিদার পরিবারে, ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর। শিবপ্রসাদ ও শিবরানি দেবীর এই সন্তানটি মায়ের ছায়ায় বড় হয়েছেন। সাহিত্যের প্রথম স্বাদও তিনি ধার্মিক মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন আর ভবঘুরে হওয়ার স্বভাব বাবার বদ্যান্যতায়। শিবরাম ছিলেন আদ্যোপান্ত আপন মর্জির মালিক। মূলত রম্য লেখক হলেও তাঁর লেখার হাতেখড়ি কবিতা দিয়ে। সাহিত্যসম্ভারে, ১০ নম্বর বাড়ির রহস্য, মহাযুদ্ধের ইতিহাস, হর্ষবর্ধন গোবর্ধন, দেবতার জন্ম, লাভপুরের ডিম, নরখাদকের কবলে, বৈজ্ঞানিক ভেবাচ্যাকা, স্ত্রী মানে ইস্তিরি’র মতো অজস্র রচনা। তাঁর বিখ্যাত লেখা ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ সিনেমায় তুলে ধরেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। খামখেয়ালি এই মানুষটি কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে পরিচিত হন এবং কারাবাসও করেছিলেন।
ছিলেন আদ্যোপান্ত সহজসরল ও আপনভোলা। দিনে ভিখারিদের সঙ্গে মিশে খাওয়াদাওয়া সেরে সন্ধ্যাবেলায় তাঁকে সাহিত্যচর্চায় শামিল হতে দেখা যেত। পরিচিতরা নিমন্ত্রণ করলে এককথায় রাজি হয়ে যেতেন। খেতে বসে খাওয়া বেশি হয়ে গেলে মাঝখানে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেয়ে নিয়ে আবার খাওয়া শুরু করতেন। যুক্তি থাকত, ‘খাবার তো নষ্ট করা যাবে না।’ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলেও তাঁদের থোড়াই কেয়ার! রসিক মানুষটিকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতেন, ‘লেখেন কখন?’ শিবরাম জানাতেন, প্রতিদিনই তিনি ভাবেন সকালের খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম নেবেন, আবার দুপুরে কোথাও যেতে গেলে ভাবেন এখন থাক একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। আবার রাত হলে খেয়েদেয়ে ভাবতেন এখন ঘুমোনোই ভালো। প্রশ্নকর্তার ফের প্রশ্ন, ‘তাহলে লেখেন কখন?’ শিবরামের স্বভাবসুলভ উত্তর থাকত, ‘কেন! পরের দিন!’ বুঝুন কাণ্ড।
জীবনের অঙ্ক নয়, জীবনের গভীর বোধ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল শেষ দিন পর্যন্ত। তাই মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগেও তিনি বলেছিলেন ‘ফার্স্ট ক্লাস আছি।’ তাঁর জীবনবোধ আমাদের ঠিকমতো প্রভাবিত করলে তার থেকে ভালো কিছুই হতে পারে না।
(লেখক স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজসেবী। গয়েরকাটার বাসিন্দা)
The put up হাজার কষ্টেও সবসময় ‘ফার্স্ট ক্লাস’ appeared first on Uttarbanga Sambad.
