(স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করতে এলজিবিটিকিউ প্লাসদের মর্যাদার স্বীকৃতি ও তাঁদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।)
শেখর সাহা
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনই চিকিৎসার সময় সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমাজের সব মানুষের অভিজ্ঞতা এক নয়। এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের মানুষ, বিশেষ করে ট্রান্সজেন্ডার ও লিঙ্গবৈচিত্র্যময় ব্যক্তিরা এখনও নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। সামাজিক লাঞ্ছনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের কারণে অনেকেই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন। এর প্রভাব পড়ে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাই স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন আজ আর কোনও প্রান্তিক আলোচনার বিষয় নয়। স্বাস্থ্য সমতা প্রতিষ্ঠা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক শর্ত।
অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনও মানুষ তাঁর যৌন অভিমুখিতা, লিঙ্গপরিচয় বা লিঙ্গপ্রকাশের কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না। হাসপাতালের নথিভুক্তিকরণ থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই রোগীর পরিচয়কে সম্মান জানানো প্রয়োজন। রোগীর পছন্দের নাম ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপলব্ধি করতে হবে যে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের স্বাস্থ্যচাহিদা শুধু যৌনস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা এবং হরমোনজনিত পরিচর্যাও এর অন্তর্ভুক্ত।
ভারতে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের নালসা রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র লিঙ্গপরিচয়কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি অধিকার সুরক্ষা আইন এবং ২০২০ সালের বিধিমালা এই অধিকারকে আইনি ভিত্তি দেয়। কিন্তু আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুযোগের ক্ষেত্রে এখনও বহু মানুষ বঞ্চনার শিকার হন। সাম্প্রতিক সময়ে আইনের সংশোধন এবং তার প্রয়োগ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ফলে অধিকারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রকের উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের চিকিৎসা সংক্রান্ত মানসম্মত কার্যপদ্ধতি প্রকাশ করা হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল এই নির্দেশিকাগুলিকে সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, জেলা হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া। জনসংখ্যার তথ্যও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালের জনগণনায় ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে প্রায় ৪ লক্ষ ৮৮ হাজার মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা সমগ্র এলজিবিটিকিউ প্লাস জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। ভবিষ্যতের জনগণনায় পুরুষ, নারী এবং ট্রান্সজেন্ডার এই তিনটি শ্রেণিতে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ পরিসংখ্যানে কোনও জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের দৃশ্যমান করে তোলে।
তবে স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিচয়পত্রের প্রশ্নও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একজন মানুষ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা সমাজে বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তার প্রভাব স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে। তাই সমন্বিত নীতি গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কেও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় যুক্ত করতে হবে। জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। একটি মানবিক রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু তার পরিকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটি কতটা সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগ পেলেন, সেটিই প্রকৃত মানদণ্ড। অন্তর্ভুক্তি কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি একটি অধিকার। সেই অধিকারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পূর্ণতা পাবে।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

