- সন্দীপন নন্দী
সে ছিল ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়। স্বপ্নই তো। কিন্তু শেষমেশ যাহা দিবাস্বপ্ন হইয়াই রহিয়া গেল। ঘটনাক্রমে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বের অলিগলিতে শুরু হয়েছিল নিরন্তর বিতর্ক আর বাদানুবাদ। অবশেষে যাবতীয় কথার পাহাড় সরিয়ে এ বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো।
কিন্তু যে নামটি নিয়ে আমেরিকার প্রত্যাশা ছিল বিপুল ও অভ্রভেদী, তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম শ্রী ডোনাল্ড জে ট্রাম্প। এরপর মার্কিন মুলুকেও রাতারাতি বিক্ষোভ ওঠে যে, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক অবদান রেখেও মহামহিম ট্রাম্পজি আবারও নোবেল পুরস্কার হতে বঞ্চিত হলেন। অনুমান, সাহেব বঙ্গবাসী হলে নির্ঘাত গাইতেন, ‘আমি তার মুখের কথা শুনব বলে গেলাম কোথা, শোনা হল না হল না, ফিরে এসে নিজের দেশে এই যে শুনি।’
মহামান্য পাঠক একবার কল্পনা করুন নোবেল পাওয়া কি মুখের কথা?
ঐতিহ্যের মানমন্দিরে নোবেল শান্তি পুরস্কার তো কেবল রাশভারী সম্মাননা নয়, কালে কালে এটি বিশ্বের শান্তি, মানবাধিকার ও সহনশীলতা রক্ষণে অন্যতম প্রতীক প্রতিপন্ন হয়ে এসেছে। নথি ঘেঁটে দেখা যায়, নরওয়ের নোবেল কমিটি সাধারণত যেসব বিষয় বিবেচনা করে এ পুরস্কার প্রদান করে, প্রথমত, আন্তর্জাতিক সংঘাত অবসানে কার্যকর ভূমিকাগ্রহণ। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার সুরক্ষা ও গণতন্ত্র রক্ষায় বিশেষ অবদান এবং তৃতীয়ত, সমাজ সহিষ্ণুতার মাধ্যমে পারস্পরিক আলোচনার পথ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দ্বারা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি। ব্যক্তির ‘জনপ্রিয়তা’ বা ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ নোবেল অর্জনে কোনও বিশেষ ভূমিকাই রাখে না।
তবু ট্রাম্প স্বঘোষিত আকাঙ্ক্ষায় প্রকাশ্য দিবালোকে বারবার বলেছেন, ‘আমি যেসব শান্তিচুক্তি করেছি, তার জন্য অন্য যে কেউ হলে অনেক আগেই নোবেল পেত।’ তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলো-মঞ্চ-শ্রোতা পেলেই মাইক্রোফোন হাতে তিনি মগ্ন হয়েছেন নিবিড় আত্মস্তুতিতে। বাস্তবে যে বয়ানের মাথামুণ্ডু না থাকায় প্রমুখের ভাষ্যকে মুখস্থ নাটকের সংলাপ মনে হয়েছে সবসময়।
কী সেই সমস্ত ডায়ালগ? ১) আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইজরায়েল ও একাধিক আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছি ২) উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক কথাবার্তায় কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে সরাসরি সংঘাত আটকেছি ৩) আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার চুক্তি করে তালিবানের সঙ্গে সমঝোতা করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছি। এখানেই শেষ নয়, ভারত-পাকিস্তানের মাঝে শুল্কনীতির জুজু দেখিয়ে পরমাণু যুদ্ধ পর্যন্ত স্তব্ধ করতে ট্রাম্পজি নাকি মুখ্য কৃতিত্ব দাবি করেছেন অন্তত ৪০ বার। একে তাই দ্বিতীয় গর্জনশীল চালিশা বলাই যায়!
এ প্রসঙ্গে মাননীয় পাঠক শ্রবণ করুন, ট্রাম্পের হাত হতে এবারও নোবেল পিছলে পড়ার অন্যতম হেতু ওঁর নিয়ন্ত্রিত শান্তিচুক্তিকারীদের অধিকাংশই সাদাকালো কাগজে সীমাবদ্ধ, আক্ষরিক অর্থে তা সার্থকতা অর্জন করতে পারেনি।
তবু ব্যক্তিটির গালগল্পের অন্ত নেই। দেবস্তুতির আত্মঢাক বিসর্জন শেষেও বেজে চলেছে অবিচল। আর এমনতরো বিরল মার্কিন দেবাংশীকে নিয়ে দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘শান্তি কেবল বৈঠক বা ছবি তোলার মাধ্যমে আসে না, আসে স্থায়ী প্রভাবের মাধ্যমে এবং যা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত।’ লে মন্ডে পত্রিকা লিখেছে, ‘শান্তির পুরস্কার এমন নেতার হাতে যায় না যিনি একই সঙ্গে বিভাজন ও বিরোধের প্রতীক।’
অথচ এ সত্ত্বেও ট্রাম্প স্বয়ং ও তাঁর সমর্থকরা যেভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় হ্যাংলার মতো নোবেল প্রাইজের দাবিতে হন্যে হয়েছেন তা হয়তো কমিটির কাছে নেতিবাচক বার্তাই প্রেরণ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেফরি স্টাফলো সে প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যখন কেউ পুরস্কার পাওয়ার জন্য এতটা জোর করে তখন তা শান্তির স্থলে আত্মপ্রচার বলেই ভ্রম হয়।’ আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে প্রস্থান, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি প্রত্যাহার, হু থেকে বেরিয়ে আসা সহ ন্যাটো নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিশ্ব শান্তিকে টলমল করেছে। ফলে নোবেল কমিটির এমন দৃষ্টান্ত নেই যে, কখনও প্রতিক্রিয়াশীল এরূপ সিদ্ধান্তকে তারা সাগ্রহে পুরস্কৃত করেছে।
তাই মহার্ঘ শান্তি পুরস্কারের জয়যাত্রা নিয়ে ট্রাম্পের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োর্গেন ভাটনে ফ্রিডনেস ব্যাখ্যা করেন, তাঁরা শুধু আলফ্রেড নোবেলের কাজ ও ইচ্ছার ভিত্তিতেই প্রতিবছর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ফলাফল? ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বৈরাচারী মাদুরো সরকারের একনায়কতন্ত্র থেকে ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তিত সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে মাচাদোর মতো মহিলাকে এবছর পুরস্কৃত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নোবেল কমিটির নিরপেক্ষতা আংশিক হলেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
কিন্তু এরপরও শ্রীযুক্ত ট্রাম্প থামেননি। উত্তরোত্তর আলটপকা যুক্তির মূর্তি খাড়া করেই গিয়েছেন। কী? ‘আমি এসব কিছু নোবেল পুরস্কারের জন্য করিনি। আমি অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলাম।’ যুক্তিবোধ বলে আষাঢ়ে গল্প বলায় নোবেল থাকলে বৃদ্ধলোকটিকে এত অযুতনিযুত কাঠখড় পোড়াতে হত না। হোয়াইট হাউসের আলমারিতে অচিরেই প্রতীক্ষিত স্বর্ণাভচাকতিখানি শোভা পেত।
এখন প্রশ্ন, ট্রাম্পের কি এসব শোভা পায়? আজ অবধি সর্বাধিক ৪৪৩টি নোবেল যে দেশের ঝুলিতে সেই দেশের রাষ্ট্রনায়কের এহেন আচরণ কি আদৌ স্বাভাবিক? অলক্ষ্যে অসীম স্পৃহা থেকে কুকথার পঞ্চমুখেও কণ্ঠে তিনি বিষধারণ করেছেন নিত্যদিন। পবিত্র ক্রোধে বলেছেন, ‘ওবামা কিছুই না করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল। নোবেল কমিটি ওবামাকে পুরস্কার দিয়েছে আমেরিকার ক্ষতি করার জন্য।’
হে ট্রাম্প, হে নীলকণ্ঠ, আপনার তো থামার বিন্দুবৎ লক্ষণ নেই। অবিরল বলেই চললেন, ‘আমি সাতটি যুদ্ধে স্থগিতাদেশ দিয়েছি। ইউক্রেন-রাশিয়াও থামার মুখে। সাম্প্রতিক অতীতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিটা ধরলে আমার আটখানা নোবেল পাওয়া উচিত।’
কিন্তু যা দৃশ্যমান তা হল, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক শান্তির কথা বললেও আপন দেশে তার প্রশাসন বিভক্ত ও অশান্ত। তিনি স্বয়ং অভিবাসীদের বহিষ্কারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিযান শুরু করেছেন। হরবখত বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেই চলেছেন। শোনা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের নামে সেনাবাহিনীও নামিয়েছেন মার্কিন শহরগুলোতে। এই তো তাঁর কীর্তি! দাদার কীর্তি!
শুধু তাই নয়, কুবেরপুরীর যে যক্ষরাজ বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়েছেন পৃথিবীর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে।
তবু তাঁর হয়ে স্তাবকস্তুতির অন্ত নেই। নোবেল শান্তি পুরস্কারে এ বছর ট্রাম্পের নাম অবলীলায় প্রস্তাব করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত ও পাকিস্তানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাহাবাজ শরীফ। তবে এসব মনোনয়নও সময়সীমার পর জমা পড়ায় বিবেচনার আওতাভুক্ত হয়নি। ফলে নিয়মনীতির শৃঙ্খলাতেও ট্রাম্পপন্থীরা ব্যাডবয় থেকে গেলেন। যেমন গুরু তেমন শিষ্য।
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় সামরিকবাহিনীর এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এবার আমি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেলে সেটি হবে আমেরিকার জন্য বড় অপমান। পরিবর্তে তারা এমন কাউকে পুরস্কার দিক যে কিছুই করেনি। হয়তো এমন কাউকে দেবে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা নিয়ে একটি অনবদ্য গ্রন্থ লিখেছে।’ ফলে কোনও মূল্যেই তাঁর প্রলাপ থামানো যায়নি।
একসময় আলফ্রেড নোবেল চেয়েছিলেন, পৃথিবীতে এমন পরিবেশ তৈরি হোক যেখানে যুদ্ধই বাধবে না। আসলে যুদ্ধ থামানোর চেয়েও বড় কৃতিত্ব যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে না দেওয়া। সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা আগাগোড়া বিপরীত, বিমুখ। গাজায় নিয়মিত গণহত্যার ক্ষেত্রে প্রথমদিন থেকে ইজরায়েলের পাশে থেকেছেন ট্রাম্প।
সুতরাং এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ট্রাম্পের নাম কখনোই প্রত্যাশিত ছিল না, তা ছিল এক অন্তঃসারশূন্য প্রোপাগান্ডা। শুধুমাত্র জীবনের প্রান্তবেলায় এক পুরুষের সুদীর্ঘলালিত ‘শান্তিতে নোবেল’ নামক স্বপ্নটি শান্তিতে কবরে চলে গেল, ইহাই করুণার। কলঙ্কেরও নয় কি?
এসবের পরও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের। ‘অডাসিটি অফ হোপ’ স্মৃতিকথায় বারাক ওবামা লিখেছেন, নোবেল পাওয়ার কথা শুনে সবার প্রথমে মনে প্রশ্ন জেগেছে ‘কীসের জন্য?’ এদিকে, মালালা ইউসুফজাই মাত্র ১৭ বছরে নোবেল পেলেও গান্ধীজি পাঁচবার মনোনয়ন পেয়েও পুরস্কার পাননি। আবার মুহাম্মদ ইউনূস-এর সর্বোচ্চ সম্মান লাভের পরেও বাংলাদেশে হিংসা ও বিদ্বেষে প্রত্যক্ষ মদত দেবার কারণে বিশ্বে সমালোচিত হয়েছেন। জগতে নোবেল শান্তি পুরস্কারের ব্রেকিং নিউজ আপাতত এখানেই সমাপ্ত হল।
(লেখক সাহিত্যিক)
