স্ববিরোধী বদলের কৌশলে সংঘ দীর্ঘায়ু

স্ববিরোধী বদলের কৌশলে সংঘ দীর্ঘায়ু

শিক্ষা
Spread the love


 

  • জয়ন্ত চৌধুরী

যত বেশি জানে, তত কম মানে। শতাব্দীপ্রাচীন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত- যত কম জানে, তত বেশি মানে। একশো বছর ধরে টিকে রয়েছে আরএসএস। এটা বললেও সবটা বলা হয় না। একদিকে আরএসএস সম্পর্কে জনতার বিশেষত রাজনীতিকদের অজ্ঞ ও অস্বচ্ছ ধারণা, অন্যদিকে ঘোষিত লক্ষ্যে স্থির থেকেও কৌশল বদলের স্বার্থে নিজের নির্মিত ইতিহাসের নির্দ্বিধ বিনির্মাণ। সংঘের আয়ু দীর্ঘায়িত হওয়ার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

গত বিজয়া দশমীর দিন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ একশো বছরে পা দিল। এটা তার জন্মতিথি। কিন্তু খাতায়-কলমে সামাজিক সংগঠনটি শুধু ইতিহাসে থেকে যায়নি, আসমুদ্রহিমাচলে তার বিস্তার। ১৯২৫ সালে তার সূচনা মহারাষ্ট্রের নাগপুরে। একশো বছর আগে অবিভক্ত ভারতের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৫ কোটি। আজকের ভারত প্রায় ১৫০ কোটির বাসভূমি। সেই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির চালিকাশক্তি আরএসএস নামের ‘এনজিও’টি।

ব্রিটিশ বিদায়, স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বিশ্বায়ন। সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষাদীক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি- উত্তর আধুনিকতা থেকে উত্তর সত্য। স্টেট থেকে ডিপ স্টেট। এই বহুবর্ণের, বহুমাত্রিক বদলের মধ্য দিয়ে যেতে দশকে দশকে চলেছে ভাঙাগড়া। সেই আবহে একশো বছরব্যাপী একটা সংগঠন বহাল। বর্তমান ভারতের শাসকদলের অক্সিজেন আরএসএস।

দু’দিন আগেও কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের দলতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতির সংশ্রব স্বীকার করত না আরএসএস। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে সাবেক ভারতীয় জনসংঘ বা ভারতীয় জনতা পার্টি একটা ধোঁয়াশা বজায় রেখে চলত। কিন্তু অতি সম্প্রতি অর্থাৎ সংঘের শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কোনও রাখঢাক না রেখেই একদা তিনি যে সংগঠনের প্রচারক ছিলেন, সেই আরএসএসের স্তুতি করলেন। তাও সরকারি মঞ্চ থেকে।

সংঘের শতবর্ষে ভারতমাতার ছবি খচিত একশো টাকার মুদ্রা প্রকাশ করে সংগঠনটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পর্যন্ত দিলেন। যে মুদ্রায় লিখিত রয়েছে সংঘের মূল ‘মন্ত্র’। সংবিধানগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের এমন আধিপত্য প্রদর্শনের নজির দ্বিতীয়টি নেই। স্বভাবতই তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। মূলত মার্কসবাদীরা মতাদর্শগত স্তরে ও জাতীয় কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দল হিসেবে, প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি থেকে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিবাদ করেছে।

গত একশো বছর ধরেই, বিশেষত স্বাধীনতা আন্দোলনের পর্ব থেকে সংঘকে নিয়ে বিতর্ক চলছে। দেশভাগ, স্বাধীন ভারতে প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিসন্ত্রাস, গান্ধিজিকে হত্যা ইত্যাদি সংঘের ইতিহাসে এক-একটি বিতর্কিত মাইলফলক। ধর্মীয় বিদ্বেষজনিত সন্ত্রাসের অপর মাইলফলক বাবরি মসজিদ ধ্বংস। এর মধ্যবর্তী যাত্রাপথ মোটেই সরলরৈখিক নয়। বরং অতীব দুর্গম, বন্ধুর। পদে পদে সংঘাতদীর্ণ ও বিতর্কবিদ্ধ তার এই অভিযাত্রা।

ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের তোষণ, হিন্দু-মুসলমান সামাজিক বিভাজন থেকে কংগ্রেস বিরোধিতার অনিবার্য পরিণতি গান্ধি হত্যা। যার পরিণতি সংঘকে নিষিদ্ধ করা। এরপর ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থায় এবং সর্বশেষ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর আরএসএস ফের নিষিদ্ধ হয়। পরাধীন ভারতে একবার এবং স্বাধীনতা উত্তর দেশে তিনবার নিষিদ্ধ হওয়া সেই সংগঠন আজ ভারতের শাসকদল বিজেপির প্রাণভোমরা।

সংঘ যখন যখন নিষিদ্ধ হয়েছে, তাৎপর্যপূর্ণভাবে তখনও ভারতের সংসদীয় রাজনীতির অনুশীলনে বহাল থেকে গিয়েছে বিজেপি। নিষিদ্ধ হয়নি। আবার সংঘও কখনও বিজেপির অঙ্গীভূত হয়ে যায়নি। নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রে প্রথম কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট বর্জিত সরকার গড়েন বিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অটলবিহারী বাজপেয়ী। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে হিন্দুত্ববাদের রাষ্ট্রীয় উত্থানের সেই শুরু।

২০০৪ সালে সেই সরকারের পতনের পর আবার এক দশকের অপেক্ষা। তারপর ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় এনডিএ সরকার। যার লাগাতার শাসনের এগারো বছরের মাথায় সেই এনডিএ’র মতাদর্শগত আধার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ। সংসদীয় রাজনীতির অনুশীলনে বিজেপিকে গত ২০২৪ সালে লোকসভায় একক গরিষ্ঠতা খুইয়ে শরিকনির্ভর হতে হয়েছে।

বিজেপির চলার পথে বন্ধুরতা থাকলেও সংঘ কিন্তু অবিচল গতিতে এগিয়ে চলেছে। সময়ের ওঠা-পড়া বিজেপির গায়ে লাগলেও সংঘের লাগেনি। একশো বছর ধরে টিকে থাকার পাশাপাশি সংঘ পরিবারের বিস্তৃতি ভারতের রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজেও প্রায় সর্বস্তরে। দিনে দিনে প্রাসঙ্গিকতা বেড়েই চলেছে। বয়সের ভারে সংকুচিত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। একটা সংগঠনের বড় সাফল্য তো বটেই।

কিন্তু কী সেই জাদু, যার বলে সংঘের এই দীর্ঘায়ু? এককথায় সংঘ সম্পর্কে অজ্ঞতা। জনমানসে বিশেষত ভারতের রাজনীতিক মহলের অজ্ঞতাপ্রসূত অস্বচ্ছ ধারণা সংঘের টিকে থাকার জাদুকাঠি। অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো খণ্ডিত কিছু ধারণা থাকতে পারে। এই অতি দক্ষিণপন্থার উলটোদিকে থাকা কংগ্রেস বা বামপন্থীদের সামগ্রিকভাবে সংঘ সম্পর্কে সম্যক ধারণাই নেই। বরং সংঘের মোকাবিলায় নরম হিন্দুত্ব আয়ত্ত করে চলেছে সমস্ত অবাম রাজনৈতিক দল।

এই অস্বচ্ছতাই সংঘের পথ মসৃণ করেছে। বস্তুত আপাতভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে হরেক কিসিমের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বিঘ্নে সামরিক নিষ্ঠায় সেরে চলেছেন স্বয়ংসেবকরা। বিরোধীরা বিজেপি শাসককে ফ্যাসিস্ট, নাজি ভক্ত বলে গলা চড়ালে বিজেপির দুটো আসন কমে বা বাড়ে বটে। কিন্তু তার সঙ্গে সংঘের বিস্তারের কোনও সম্পর্ক থাকে না।

মনে রাখতে হবে, স্বাধীন ভারতের ২২ বছর বাদ দিলে বাকি প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকের মধ্যে সাকুল্যে ১৬ বছর দিল্লির মসনদে বিজেপি। অর্থাৎ রাজনৈতিক শাখার ক্ষমতায়ন নিরপেক্ষে সংঘের সামাজিক স্তরে প্রভাব বিস্তারের রেখাচিত্র সদা ঊর্ধ্বমুখী। বিজেপি আদতে সংঘের বাফার। তাই তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সমালোচকরা ভোটের রাজনীতির নিরিখে সংঘের মূল্যায়নে নিজেদের আবদ্ধ রাখে।

কিন্তু সংঘের হিন্দুত্বের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কতটা অপ্রতিরোধ্য, তা টের পাওয়া যায় ভোটের মরশুমে। ধর্মীয় আচরণকে রাজনীতি-বিযুক্ত করার তত্ত্ব উজাড় করা নেতারা নিজেকে হিন্দু প্রমাণে মিডিয়া ডেকে নানা অছিলায় ধর্মস্থানে মাথা ঠুকতে মরিয়া হন। কিন্তু দেখা যায় বিজেপিকে ভোটে পর্যুদস্ত করলেও হিন্দুত্বের সামাজিক ভিত্তি আরও পোক্ত হয়।

তাই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্রকে কলুষিত করে হিন্দু মন্দির বানাতে হয়। ভোট প্রচারে লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে কেরলে গিয়ে মালয়ালি প্রথা মেনে শবরীমালায় পুজো দিতে হয়। একশো বছর ধরে যে হিন্দু রাষ্ট্রবাদী মতবাদ আঁকড়ে রয়েছে সংঘ- এসব তার সাফল্যের নিদর্শন। যে জাদুবলে শতায়ু হয়েও জরার লক্ষণহীন সংঘ। সংঘ নিয়ে যত আপত্তিকর সংবাদ প্রকাশ বা সম্প্রচারিত হোক না কেন, আরএসএস কখনও পালটা জবাব বা ‘রিজয়েন্ডার’ দেয় না।

সদস্যপদ বলে কিছু নেই। তাই আনুষ্ঠানিক বহিষ্কার বা মেম্বারশিপ গ্রহণ সংঘের অভিধানে নেই। নেই কোনও পাথুরে দলিল। তাই অখণ্ড হিন্দু ভারত রাষ্ট্রের মতাদর্শে একশো বছর অটল থাকলেও স্ববিরোধী বদল ঘটেছে সংঘের। নীতি নয় কৌশল বদলে নিজেদের ইতিহাসকেও অস্বীকার করে চলেছে।

স্বাধীনতা আন্দোলনে হেডগাওয়ারের কারাবাস নিয়ে বাগাড়ম্বর চলছে। গান্ধি খুনের পর সংঘকে সন্ত্রাসী বলে অভিহিতকারী বল্লভভাই প্যাটেলকে আত্মসাৎ করেছে বিজেপি। যাদের আদর্শ পুরুষ গুরুজি গোলওয়ালকার তেরঙা পতাকার বিরোধিতা করেছিলেন, আজ তাদের উত্তরসূরি মোহন ভাগবত নাগপুরে স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা তুলছেন। বিজেপি সরকার হর ঘর তিরঙ্গা প্রকল্প নিয়েছে। আত্মসাতের তালিকায় রয়েছেন আম্বেদকরও।

এমনকি দ্বিতীয় সরসংঘচালক গুরুজি, যাঁর বক্তৃতা সংকলন ‘বাঞ্চ অফ থটস’ এতকাল স্বয়ংসেবকদের অন্যতম আকর গ্রন্থ বলে বিবেচিত হত, সেই মুসোলিনি অনুরাগীর বই নতুন করে ছাপা বন্ধ করেছে নাগপুর। এমনই ভোল বদল। একদিকে, বিজেপিকে ঢালের মতো ব্যবহার করে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আড়ালে রেখে কাজ হাসিল করছে। অন্যদিকে, নিজের ইতিহাসকে নিজেই অস্বীকার করে সংঘ নিজেকে বদলে একধরনের বিভ্রম নির্মাণ করে চলছে। এই দ্বিমুখী কৌশলই মূলত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতায়ু হওয়ার জাদুমন্ত্র।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *