শেখর সাহা
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি ক্ষমতায় আসার সময় ভারতবাসীর সামনে যে স্বপ্নের ছবি তুলে ধরা হয়েছিল, দশ বছর পরে সেই ছবির সঙ্গে বাস্তব ভারতের মিল কতটা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক কেভিন গ্রিয়ার ও রবিন গ্রিয়ার। তাঁদের গবেষণাপত্র ‘প্রমিসেস, প্রমিসেস : গভর্ন্যান্স অ্যান্ড গ্রোথ ইন ইন্ডিয়া আন্ডার মোদি অ্যান্ড দ্য বিজেপি’ গত ১২ অগাস্ট সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্ক (এসএসআরএন)–এ প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ‘সিন্থেটিক ভারত’ অর্থাৎ পরিসংখ্যানের সাহায্যে তৈরি সম্ভাব্য ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালের পরের বাস্তব ভারতের অর্থনীতি ও শাসন ব্যবস্থার তুলনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তার কতটা পূরণ হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
ধরা যাক, পাশাপাশি দুটি গ্রাম, ‘ক’ এবং ‘খ’। দুটি গ্রামই প্রায় একই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। ভোটের আগে ‘ক’ গ্রামের মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এসে বললেন, আগামী পাঁচ বছরে রাস্তাঘাট, পানীয় জল, বিদ্যালয় সহ গ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করবেন। ‘খ’ গ্রামের মানুষকে অন্য দলের প্রতিনিধিরা বললেন, গ্রামের উন্নয়নের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন। পাঁচ বছর পর দেখা গেল, প্রথম দলটি বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের ফল ততটা ভালো হয়নি, অথচ অন্য দলটি তেমন বড় ঘোষণা না দিয়েও গ্রামের উন্নয়নে বেশি কাজ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘সিন্থেটিক ভারত’-এর ভাবনা বোঝা যায়। শুধুই ভোটের প্রতিশ্রুতির দিকে না তাকিয়ে, বাস্তবে একটি সরকার কতটা কাজ করেছে, তা তুলনা করে দেখার চেষ্টা।
একই রকম জমি নিয়ে চাষ করছেন দুই কৃষক। প্রথম কৃষক ঘোষণা করলেন, এবার তিনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ ফসল ফলাবেন। দ্বিতীয় কৃষক কোনও বড় ঘোষণা করলেন না। বছর শেষে দেখা গেল, প্রথম কৃষকের ফলন ২০ শতাংশ বেড়েছে, দ্বিতীয় কৃষকের ৩০ শতাংশ। প্রথম কৃষক বলতেই পারেন, তাঁর ফলন তো বেড়েছে। কথাটি সত্যি। কিন্তু প্রশ্ন উঠবেই, দ্বিগুণ ফলনের প্রতিশ্রুতির তুলনায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধিকে কীভাবে সাফল্য বলা হবে? এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য, উন্নতি হওয়া এক কথা, আর নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির তুলনায় উন্নতি হওয়া আরেক কথা।
২০১৪ সালের পর ভারতের অর্থনীতি ও গণতন্ত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তার কতটা মোদি সরকারের নীতির কারণে আর কতটা সময়ের স্বাভাবিক প্রভাব, তা আলাদা করে বোঝা কঠিন। তাই গ্রিয়ার ও গ্রিয়ার ১৯৮৪ থেকে ২০১৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে মিল থাকা কয়েকটি দেশের তথ্য নিয়ে একটি ‘সিন্থেটিক ভারত’ তৈরি করেন। ২০১৪ সালের পর বাস্তব ভারতের সঙ্গে এই সম্ভাব্য ভারতের পার্থক্য দেখেই তাঁরা পরিবর্তনের মাত্রা বোঝার চেষ্টা করেছেন। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইথিওপিয়া, চিন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিপিন্সের তথ্য নেওয়া হয়েছে। তুলনায় ইথিওপিয়ার অংশ ৩৮ শতাংশ, চিনের ২৮ শতাংশ, বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ, পাকিস্তানের ৭ শতাংশ এবং ফিলিপিন্সের ২ শতাংশ। গবেষকদের যুক্তি, ১৯৮৪ থেকে ২০১৩ সময়ে দেশগুলির এই মিশ্রণ ভারতের মাথাপিছু আয়ের গতিপথকে খুব কাছাকাছি অনুসরণ করেছিল।
তবে গণতন্ত্র ও শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একই দেশ ব্যবহার করা হয়নি। চিনের মতো একদলীয় রাষ্ট্রকে ভারতের গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা অর্থহীন। তাই এই অংশে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স ও শ্রীলঙ্কার মতো গণতান্ত্রিক দেশকে তুলনার ভিত্তি করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ভোটে নরেন্দ্র মোদির প্রচারের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল ‘অচ্ছে দিন আনেওয়ালে হ্যায়’। এর সঙ্গে ছিল উন্নয়ন ও ‘ন্যূনতম সরকার, সর্বোচ্চ শাসন’-এর প্রতিশ্রুতি।
তাই গবেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল, মোদি সরকার কি শুধু ভারতকে এগিয়ে দিয়েছে, নাকি ২০১৪ সালের আগের সম্ভাব্য গতিপথের তুলনায় আরও বেশি এগিয়ে দিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁরা তৈরি করেছেন ‘সিন্থেটিক ভারত’। গবেষণায় গণতন্ত্র ও শাসন ব্যবস্থার ১০টি সূচক দেখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনি ও উদার গণতন্ত্র, আইনসভা ও বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ, আইনের সমতা, দুর্নীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা। গবেষকদের হিসাবে ১০টি সূচকেই বাস্তব ভারতের অবস্থান সিন্থেটিক ভারতের তুলনায় খারাপ হয়েছে। নির্বাচনি গণতন্ত্রে ব্যবধান প্রায় ৬০ শতাংশ, উদার গণতন্ত্রে ৬৯ শতাংশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ৫৬ শতাংশ এবং সংগঠনের স্বাধীনতায় প্রায় ৩০ শতাংশ। ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও অবনতির কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক দুর্নীতির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এগুলি সরাসরি মানুষের সংখ্যা বা ভোটের হিসাব নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি সূচক দিয়ে এই পরিবর্তনগুলি মাপা হয়েছে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গবেষণাটি বিশেষভাবে ভি-ডেমের তথ্য ব্যবহার করেছে।
গবেষণার দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন ছিল অর্থনীতি। ২০১৪ সালের পর ভারতের অর্থনীতি বেড়েছে, এ কথা গবেষকেরা অস্বীকার করেননি। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, এই বৃদ্ধি কি মোদি-পূর্ব ভারতের সম্ভাব্য গতিপথের চেয়েও বেশি? তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাস্তব ভারত ও ‘সিন্থেটিক ভারত’-এর মাথাপিছু আয় প্রায় একই পথে এগিয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। ২০২৩ সালের দিকে এসে বাস্তব ভারতের মাথাপিছু আয় সম্ভাব্য ভারতের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম, অর্থাৎ প্রায় ১,০০০ ডলার কম বলে গবেষণায় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের বক্তব্য, মোদি আমলে ভারত এগোয়নি, এমন নয়। বরং প্রশ্ন হল, আগের গতিপথ বজায় থাকলে ভারত কি আরও বেশি এগোতে পারত?
গবেষণাটি প্রকাশের পর সরকারি মহল থেকে এর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সিনিয়ার উপদেষ্টা কাঞ্চন গুপ্তের আপত্তি, মাত্র পাঁচটি দেশের তথ্য দিয়ে তৈরি ‘সিন্থেটিক ভারত’ বাস্তব ভারতের যথাযথ প্রতিচ্ছবি নয়। দেশ বাছাই ও ব্যবহৃত তথ্য নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, অন্য তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করলে ফল ভিন্ন হতে পারে। গ্রিয়ার ও গ্রিয়ার অবশ্য এই সমালোচনা মানেননি। তাঁদের বক্তব্য, দেশগুলি ইচ্ছেমতো বেছে নেওয়া হয়নি; গবেষণার নিয়ম মেনেই তুলনাযোগ্য দেশ নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের মতে, বেশি দেশ নিলেই ফল ভালো হয় না, ভুল দেশ বেছে নিলে বরং গবেষণার পক্ষপাত বাড়তে পারে।
‘প্রতিশ্রুতি, প্রতিশ্রুতি’ গবেষণায় ‘সিন্থেটিক ভারত’ আসলে একটি পরিসংখ্যানগত আয়না। সেই আয়নায় দেখা ছবিটি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। আয়নাটি কতটা নিখুঁত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু এই আয়না সামনে এনে গবেষকরা অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন, ২০১৪ সালের আগের ভারতের তুলনায় আমরা কতটা এগিয়েছি, আর যে উন্নত ভারতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
সিন্থেটিক ভারত আসল ভারত নয়, কিন্তু একে নিছক কাল্পনিক বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সরকারকে বিচার করার দুটি পথ আছে, আগের চেয়ে দেশ কতটা এগিয়েছে এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতির তুলনায় কতটা এগিয়েছে। উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, আয়বৈষম্য, গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক স্বাধীনতা এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির হিসাবও তাই জরুরি। শেষপর্যন্ত এই হিসাবের উত্তর দেবে সময়, তথ্য ও ইতিহাস। আর ‘সিন্থেটিক ভারত’ সেই হিসাবের খাতায় থাকা একটি বিকল্প আয়না, যা নীরবে শুধু প্রশ্ন করে, ভারত এগিয়েছে, ঠিকই; কিন্তু যে ভারতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আমরা কি সত্যিই সেখানে পৌঁছেছি?
(লেখক অক্ষর ও সমাজ কর্মী।)

