মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমান পৃথিবীতে সমাজের ভালোমন্দ নিয়ে অধিকাংশের খুব মাথাব্যথা নেই। নিজেরটুকু নিয়ে বেশিরভাগ মানুষ ব্যস্ত। কে বাঁচল, কে মরল- তা নিয়ে চায়ের কাপে সামান্য তুফান তুলেই নিজের দৈনন্দিন জীবনে ডুব দেয় আমজনতা। পাশের বাড়ির বিপদে এগিয়ে যাওয়া, অন্যের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা ইত্যাদি চলতি প্রবাদে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর তাগিদ এখন কার্যত ডুমুরের ফুল।
তার মধ্যেও যে হাতেগোনা কিছু মানুষের মধ্যে এখনও মানবিকতা টিকে রয়েছে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন গজলডোবার শান্তি কলোনির পেশায় মত্স্যজীবী বিশ্বনাথ দাস, মিঠু দাস, অজয় দাস, বাবলু দাস ও গোপাল দাস। তিন-চারদিন বয়সের হস্তীশাবক মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিস্তা ব্যারেজের গেট পেরিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় তাঁদের চোখে পড়ে।
ওই মৎস্যজীবীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে নৌকায় প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ ধাওয়া করে হস্তীশাবকটিকে উদ্ধার করেন। চতুর্দিকে যখন সংবেদনশীল মানুষ খুঁজে পেতে দূরবিন লাগে, তখন একটি অবোলা প্রাণীর জন্য পাঁচজন মানুষের এই দুঃসাহসী লড়াই নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্তমূলক এবং প্রশংসনীয়। পরে বন দপ্তরের তত্পরতায় হস্তীশাবকটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া গিয়েছে।
সাধারণত মানুষের ছোঁয়া লাগলে শাবককে মা হাতি ফিরিয়ে নেয় না। তাও ভুল প্রমাণ করে ওই দলছুট শাবককে কাছে টেনে নিয়েছে মা হাতিটি। চারপাশে প্রকৃতির তাণ্ডব ও মানুষের দৈনন্দিন টানাপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা ঘুণ ধরা সমাজকে নতুনভাবে নিশ্চয়ই ভাবতে শেখাবে। অবক্ষয়ের অন্ধকারে এই ঘটনা আশার ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল প্রদীপ। বর্ষার মরশুমে তিস্তার মতো খরস্রোতা, উত্তাল নদীতে একটি অসহায় হস্তীশাবককে ভেসে যেতে দেখে আতঙ্কে পিছিয়ে যাওয়ারই কথা।
কিন্তু গজলডোবার ওই পাঁচ মৎস্যজীবী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হস্তীশাবককে নতুন জীবন দিয়েছেন। এটা শুধু সাহসের কথা নয়, বরং প্রাণীকুলের প্রতি আত্মিক অনুভূতি। বুদ্ধি, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং অসীম ধৈর্য নিয়ে তাঁরা যখন শাবকটিকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়েছিলেন, তখন তা শুধু একটি জীবনকে বাঁচিয়ে রাখা নিশ্চিত করে না, বরং জয় হয় মানবিকতার।
একটি সন্তানের সঙ্গে তার মায়ের মিলন ঘটাতে পারার আনন্দ শব্দে প্রকাশ করা কঠিন। পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যে যেখানে বন্যপ্রাণীদের জীবন হামেশাই বিপন্ন ও সংকুচিত হয়, সেখানে এমন সচেতনতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়। যখন নগরায়ণ ও আধুনিকতার নামে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে, মানুষ-বন্যপ্রাণের সংঘাত নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন গজলডোবার এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা মানবসমাজকে নতুন করে পথ দেখিয়েছে।
নির্বিচারে জঙ্গল ধ্বংসের কারণে হাতির দল লোকালয়ে চলে আসে, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির হানি করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ পালটা অত্যাচার করে প্রাণীদের। হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব যখন প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়, তখন এই পাঁচ মৎস্যজীবী প্রমাণ করে দিলেন, প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি শত্রুতা নয়, বরং ভালোবাসাই হতে পারে স্থায়ী সেতু। নিম্নবিত্ত এই মানুষদের এখন সবথেকে বেশি করে প্রয়োজন। যাঁরা শুধু নিজেরটুকু ভাবেন না। প্রয়োজনে অবোলা জীবকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।
জীবনের রসদ জোগাতে তাঁদের প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হলে কী হবে, চিন্তায় ও মননে এই মহানুভবতার পরিচয় এবং তাঁদের ওই সাহস ও সহমর্মিতা বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে সরকারি প্রচারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা বহন করছে। হস্তীশাবক উদ্ধারের ঘটনাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, মনুষ্যত্ব শুধু মানুষের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সমস্ত অবোলা প্রাণীর প্রতি দায়িত্ববোধই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। ওই পাঁচজন মৎস্যজীবীর লড়াই এবং এক মায়ের কোলে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার মহতী প্রয়াস চিরকাল অমলিন থাকবে।
The put up সার্বিক দায়িত্ববোধ appeared first on Uttarbanga Sambad.
