সনাতন পাল
উত্তরবঙ্গের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রচুর ইতিহাস। যমুনার তীরে যে হিলিতে একদা পা রেখেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, যেখানকার রেলপথ দিয়ে দেশভাগের আগে পদ্মার কাঁচা ইলিশ আর চা বাগানের প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র নিয়ে শিলিগুড়িতে পৌঁছাত ‘দার্জিলিং মেল’, সেই ঐতিহ্য (Heritage of North Bengal) আজ স্মৃতির ক্যানভাসে বন্দি। মংপুতে কবিগুরুর ছোঁয়া লাগা গৌরীপুর হাউস থেকে শুরু করে কোচবিহারের রাজবাড়ি, মদনমোহন মন্দির, ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের জন্মভূমি, কিংবা মালদার আদিনা মসজিদ ও গঙ্গারামপুরের বাণগড়- উত্তরের এই বিপুল ঐশ্বর্য কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং এক গভীর জীবনবোধ ও সংস্কৃতির পরিচয়। সরকার বাহাদুরের কিছু রক্ষণাবেক্ষণ থাকলেও, স্থানীয় মানুষের উদাসীনতা ও সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এই হেরিটেজ আজ বিপন্ন।
সৌজন্যের অপমৃত্যু ও বর্তমানের কাদা
উত্তরের শিল্প-সংস্কৃতি (North Bengal Tradition) চর্চায় মূল্যবোধ রক্ষার দায় আসলে কার? গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া, রাসের মেলা কিংবা পাহাড়ের কমলালেবুর ঘ্রাণে যে স্নিগ্ধতা ছিল, তা আজ রাজনৈতিক হানাহানি ও অসামাজিক কলুষতায় ম্লান। একদা এই উত্তরবঙ্গ ছিল পারস্পরিক সৌজন্য ও ভ্রাতৃত্বের এক পবিত্র বাসভূমি। আজ পরিস্থিতি এমন যে, অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষ সাক্ষ্য দিতেও ভয় পায়, দোকানের ঝাঁপ নেমে যায় আতঙ্কে। আগে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের মধ্যেও যে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিল, তা আজ প্রকাশ্য দিবালোকে খুনোখুনিতে পর্যবসিত হয়েছে। উৎসবের আঙিনায় এখন ভক্তির চেয়ে মদ আর জুয়ার দাপট বেশি। বালুরঘাটের মতো মফসসল শহরেও চায়ের আড্ডার সেই পুরোনো মেজাজ আজ রাজনৈতিক নিশ্বাসে রুদ্ধ। স্বাধীন মতামত প্রকাশের পথে এক অদৃশ্য ভয় বাসা বেঁধেছে। ঠিক যেমন রোদ-ঝড়-জলে প্রস্তরখণ্ড ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, উত্তরবঙ্গের অখণ্ড সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও আজ রাজনীতির আঘাতে ক্ষয়িষ্ণু। মানুষের জন্য রাজনীতি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আজ রাজনীতির যূপকাষ্ঠে সাধারণ মানুষকে বলি দেওয়া হচ্ছে, যা এক গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিতবাহী।
বিভাজিত মঞ্চ ও অনুগত শিল্পকলা
এমনকি যে নাটক এককালে সারা দেশকে পথ দেখাত, সেই নাট্যচর্চাও আজ কিছুটা ম্রিয়মাণ। বালুরঘাটের বিভিন্ন নাটকের দলের একটি অংশ এখন সৃজনশীল অনুশীলনের চেয়ে সরকারি অনুগ্রহের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একদল শিল্পী যেখানে পরিশ্রম আর যোগ্যতায় বিশ্বাসী, অন্য এক পক্ষ খড়কুটোর মতো রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে আঁকড়ে বাঁচতে চায়। এর ফলে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে এক অস্বাস্থ্যকর বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা সর্বজনীন সাংস্কৃতিক বিকাশে প্রধান অন্তরায়। নাট্য উৎসব থেকে শুরু করে গ্রামীণ মেলা- সর্বত্রই এক অদ্ভুত ক্ষমতার খেলা চলছে, যা সুস্থ সংস্কৃতির গলায় ফাঁস পরাচ্ছে। প্রতিভা নয়, বরং আনুগত্যই এখন যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উত্তরণের পথ ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতা
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান বা মেলায় বিচারকমণ্ডলীকে প্রভাবিত করার অভিযোগ। মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচিতি আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজমাধ্যমে দলবদ্ধভাবে ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো প্রমাণ করার এক কৃত্রিম ও রুগ্ন প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তি কুৎসা এখন শ্রেষ্ঠত্বের প্রশংসার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। এই মানসিক দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ ইতিহাস আর মাটির টানকে বুঝতে হলে কলুষমুক্ত সংস্কৃতির প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের মানুষকেই উদ্যোগী হতে হবে এই অবক্ষয় রুখতে। দলমতনির্বিশেষে ঐতিহ্যের উঠোনে যদি আবার মূল্যবোধকে ভিত্তি করে সম্মিলিত হওয়া যায়, তবেই এই মাটি তার হারানো গরিমা ফিরে পাবে।
(লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যিক)
