শৈশবে রিলসের থাবা ও অভিভাবকত্ব

শৈশবে রিলসের থাবা ও অভিভাবকত্ব

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


প্রযুক্তির মোহে আচ্ছন্ন শৈশব আজ বিপন্ন। সচেতনতা ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশই এখন একমাত্র বিকল্প।

সাহানুর হক

শিলিগুড়ির জংশন ছেড়ে মিনিট পঁচিশ পেরিয়েছে বাসটি। বৈশাখের অকাল বর্ষণমুখর পথে বাস আপন গতিতে ছুটলেও জানলার ধারের একটি দৃশ্য যে কাউকেই উদ্বিগ্ন করবে। এক মহিলা যাত্রীর পাশে বসা বছর পাঁচেকের খুদে মেয়েটি গভীর অভিনিবেশে ফোনে ‘রিলস’ দেখছে। রিলসের মেজাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কখনও সে হাসছে, কখনও তার চোখ টলমল করে উঠছে, আবার কখনও হাত-পা দুলিয়ে নাচের অনুকরণ করছে। অবাক করার বিষয় হল, তার অভিভাবক নিজেও সেই খুদেটির মতোই মগ্ন হয়ে রিলসের দুনিয়ায় ডুবে রয়েছেন। সেখানে একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করার চেয়ে যান্ত্রিকতাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই দৃশ্যটি কেবল একটি শিশুর স্মার্টফোন ব্যবহারের গল্প নয়, বরং এটি সরাসরি আঙুল তুলছে অভিভাবকদের সচেতনতার দিকে। যে বয়সে শিশুটির হাতে একটি কমিকস বা ছড়ার বই থাকার কথা ছিল, সেখানে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নীল আলোর এক মায়াজাল। ওই অভিভাবক নিজেও তো কোনও গল্প বা কবিতার বই পড়ে শিশুর সামনে উদাহরণ তৈরি করতে পারতেন। শিশুরা স্বভাবজাতভাবেই অনুকরণপ্রিয়; তাই বড়দের যা করতে দেখে, তারা সেটাই শেখে। অথচ আধুনিকতার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আমরা শিশুদের মননশীলতা বৃদ্ধির সুযোগগুলোকে ক্রমাগত অবজ্ঞা করে চলেছি, যা অত্যন্ত আফসোসের বিষয়।

শহর থেকে গ্রাম— আজকের দিনে প্রায় সব জায়গাতেই মা-বাবারা সন্তানের জেদ বা কান্না সামলাতে ভালোবাসার বদলে মোবাইল ফোনকেই মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে বেছে নেন। সোহাগ-মমতা বা রূপকথার গল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম রিলস। ফলে খুদে সদস্যরা অতি দ্রুত এই ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি তাদের ধীরে ধীরে ‘যন্ত্রমানবে’ রূপান্তরিত করছে, যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি তাদের আচরণে। স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ায় তাদের আচরণ রুক্ষ ও উগ্র হয়ে উঠছে, যা সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।

ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার এই চিত্রটি আজ এক সর্বজনীন সংকটের প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, সাত বছরের কম বয়সি শিশুরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ফোন বা টিভি দেখলে তাদের মধ্যে ‘অটিজম’-এর মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। উদাহরণ হিসেবে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের সেই আশ্চর্য ঘটনাটি মনে করা যেতে পারে, যেখানে মাত্র চার বছরের একটি শিশু প্রতিদিন ছয়-সাত ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহারের প্রভাবে হঠাৎ জাপানি ও চিনা ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিল। এই ঘটনাটি আধুনিক প্রজন্মের শৈশব হারিয়ে যাওয়ার এক নির্মম সত্যকেই সামনে নিয়ে আসে।

তবে সোশ্যাল মিডিয়া বা আধুনিক প্রযুক্তিকে কেবল একটি অপ্রীতিকর আয়োজন হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমান সময়ে বহু সৃজনশীল মানুষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন, যা ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্নটি যখন আগামী প্রজন্মের সুরক্ষার, তখন পরিমিতিবোধ ও সতর্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও সন্তানের প্রতি গুণমানসম্পন্ন সময় দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল এই ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে শৈশবকে বিপন্ন করার দায়ভার শেষ পর্যন্ত আমাদেরই নিতে হবে।

(লেখক গ্রন্থাগারিক) 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *